পানি নিয়ে রাজধানীবাসীর ভোগান্তির শেষ কোথায়

টি রহমান: বজ্রপাতসহ কালবৈশাখী ঝড়ের ফাঁকে ফাঁকে রাজধানী ঢাকায় এখন তীব্র গরমও পড়ছে। বৃষ্টিপাতেও কমছে না তাপমাত্রা। বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা আর গরমে অস্বস্তি। সব মিলিয়ে রাজধানীবাসীর ভোগান্তিও এখন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এ ভোগান্তিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে তীব্র পানির সংকট। সুপেয় পানির অভাব তো আছেই, রাজধানীর অনেক এলাকায় অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার্য পানির সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন পানি পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
অন্য অনেক সমস্যার সঙ্গে রাজধানীতে পানি সংকট সমস্যা দীর্ঘদিনের। তবে গরমের মৌসুম এলে এ সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত সচিত্র প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) পাম্পসহ অন্যান্য পানি সরবরাহের স্থানগুলোয় দীর্ঘ লাইন দিচ্ছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। তারপরও অনেক স্থানেই পানি মিলছে না বলে গণমাধ্যমের বরাতে জানা যাচ্ছে।
এর মধ্যেই নতুন করে রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় পানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াসা! এখন সাধারণ গ্রাহকরা প্রতি ইউনিট পানি ১০ টাকায় কিনতে পারলেও আগামী জুলাইয়ে দাম বৃদ্ধির পর তা হবে ১১ টাকা দুই পয়সা। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৩৩ টাকা ৬০ পয়সার স্থলে ৩৫ টাকা ২৮ পয়সা গুনতে হবে।
রাজধানীতে ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পানের উপযোগী নয়। এ পানি দুর্গন্ধ ও জীবাণুযুক্ত এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক অঞ্চলে পানি পান করা তো দূরে থাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজেও তা ব্যবহার উপযোগী নয়। কিছু এলাকায় পানি কিছুটা ভালো হলেও তা ফুটিয়ে ছাড়া সরাসরি পানের ভরসা কেউ করেন না। এ অবস্থায় কোনো এলাকায় পানি যদি একেবারেই পাওয়া না যায় তাহলে এলাকাবাসীর ভোগান্তি কোন পর্যায়ে পৌঁছায় তা সহজেই অনুমেয়।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর এলাকায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানিতে অংশ নিয়ে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তারা নানা ধরনের অভিযোগ জানিয়েছেন সমাধানের আশায়। তবে এগুলো আদৌ সমাধান হবে কিনা, বা কবে নাগাদ হবে তার জবাব সম্ভবত ওয়াসার কর্তৃপক্ষের কাছেও নেই। ওয়াসার সেবায় যে তাদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই, তাও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। তবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ কিন্তু এখনও সেই পুরোনো বুলিই আওড়ে যাচ্ছেন। গণমাধ্যমে তারা বলেছেন, রাজধানীতে নাকি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তা-ই যদি হবে, তাহলে এত পানি যায় কোথায়? রাজধানীবাসীর অভিযোগই বা এত কেন?
দুদকের গণশুণানিতে অংশ নেওয়া গ্রাহকদের অভিযোগগুলো বেশ পুরোনোই। একই সঙ্গে বেশ গুরুতরও বটে। অনেকের অভিযোগ দিনের অধিকাংশ সময়ই ওয়াসার লাইনে পানি থাকে না। অনেকে আবার বলছেন, ওয়াসার কাছ থেকে অর্থের বিনিময়েও অনেক সময় পানি পাওয়া যায় না। কেউবা আবার তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত ও পানের অযোগ্য পানি নিয়ে অভিযোগ করেছেন। এ নিয়ে ওয়াসাসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে বারবার অভিযোগ করেও সমাধান পাননি। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে অভিযোগ করাই বন্ধ করে দিয়েছেন। এভাবে রাজধানীতে পানি নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে নাগরিকদের।
এর মধ্যে সম্প্রতি আরও একটি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেক অঞ্চলে পানির অভাবে বাড়ি ভাড়া দিতে পারছেন না বাড়িমালিকরা। কিছু এলাকায় ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করলেও প্রয়োজনমতো পানি সরবরাহ করতে পারছেন না। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে বচসা হওয়ার মতো বিষয়ও ঘটছে প্রতিনিয়ত। অনেকে আবার পানি না থাকায় ভাড়া বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এভাবে পানির সংকটে নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী।
আবার পানি সংকটের এ সুযোগ নিয়ে রাজধানীতে অবৈধ উপায়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। তারা টাকার বিনিময়ে জারভর্তি পানি বিক্রি করছেন। সুপেয় পানির নিশ্চিত সরবরাহ পেতে তাদের শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেকেই। অথচ পরে দেখা যাচ্ছে বেশি দামে কেনা এ পানিও স্বাস্থ্যকর বা পানের উপযুক্ত নয়। গত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কোম্পানির বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করেছে। যেখানে সুপেয় পানির নামে পানের অযোগ্য জীবাণুযুক্ত পানি সরবরাহ করার অভিযোগে বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে জরিমানার পাশাপাশি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে অনেককে। তারপরও এ ধরনের কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্য থামেনি। ভোক্তার জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়ার মতো অবৈধ ব্যবসা তারা চালিয়েই যাচ্ছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের পানিতে অত্যন্ত ক্ষতিকর সব জীবাণু পাওয়া গেছে বলেও গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। এমনকি গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) একদল গবেষক তাদের গবেষণায় জানান, রাজধানীতে সরবরাহ করা জারের অন্তত ৯৭ শতাংশ পানিতে মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু ‘কলিফর্ম’ রয়েছে। এগুলো পানিতে একেবারেই থাকার কথা নয়। এছাড়া আরও অনেক ধরনের জীবাণু ও ময়লা-আবর্জনা তো আছেই। এ পানি সরাসরি ওয়াসার লাইন থেকে জারে ভরে বিক্রি করার বিষয়টিও হাতেনাতে ধরা পড়েছে। অর্থাৎ একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জেনেশুনেই টাকার লোভে মানুষের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।
ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট রাজধানীতে পানি সরবরাহকারী অন্যান্য কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর চলে যায়, এসব অব্যবস্থাপনার কথাও সবার জানা, তবু সমাধান হয় না। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা এ নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রতিশ্রুতিই কেবল দিয়ে যাচ্ছেন, তা বাস্তবায়ন আর হচ্ছে না। সময়ের সঙ্গে ভোগান্তিও বাড়ছে নগরবাসীর।
রাজধানীতে এ ধরনের ভোগান্তি কখনোই কাম্য হতে পারে না। বছরের পর বছর ধরে নগরবাসীকে একই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে কেন? এর পেছনে নিশ্চয়ই যৌক্তিক কোনো কারণ থাকতে পারে না। মাঝেমধ্যে এসব বিষয় নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিতেও দেখা যায়। রাজধানীতে পানি সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ মতামত নিতে হবে। বছরের পর বছর চলে গেলেও পানি সমস্যার সমাধান কেন হচ্ছে না, তা খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে পানির সমস্যা বা দুর্গন্ধের জন্য পুরোনো পানির লাইনকে দায়ী করছে ওয়াসা। পুরোনো লাইনের ফুটো দিয়ে বাইরের ময়লা-আবর্জনা পানিতে মিশে যাওয়া এতে দুর্গন্ধ হচ্ছে বা জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি সংস্থাটির। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে পানি খাওয়া বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয়, তার লাইন এত দুর্বল হয় কীভাবে? দীর্ঘদিন ধরেই এগুলো সমাধানের উদ্যোগই বা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
নানা ধরনের ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। তার মধ্যে পানি সমস্যা তাদের জন্য ‘ছাই চাপা আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে। এ অবস্থার অবসান হওয়াটা খুবই জরুরি। অন্যথায় রাজধানীবাসীর যে ভোগান্তি, তা সামনের দিনগুলোতে যে আরও বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। আর সে ধরনের পরিস্থিতি একটি দেশের জন্য যে মোটেও ভালো খবর হতে পারে না। এটি কর্তাব্যক্তিদের সবাই ভালো করেই জানেন।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]