পাবনার চরাঞ্চলে বাড়ছে বাদাম চাষ

শাহীন রহমান, পাবনা: পাবনার ঈশ্বরদী, সুজানগর, বেড়া, সাঁথিয়া ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলে বাড়ছে চীনাবাদাম চাষ। বাদাম চাষের জন্য চর খুবই উপযোগী ও লাভজনক হওয়ায় চীনাবাদাম চাষে ঝুঁকছেন কৃষক। তাই এ বছর জেলায় চীনাবাদাম চাষ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। বাদাম কেনাবেচার জন্য দুটি মোকাম ও ২০-২২টি আড়ত গড়ে উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, পাবনার চরাঞ্চলের মাটি বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বাদাম চাষ। গত বছর রবি মৌসুমে জেলায় এক হাজার ৫৫৪ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ হয়েছিল। এ বছর জেলার পাঁচ উপজেলায় এক হাজার ৪৫৪ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে এক হাজার ৮৭১ হেক্টর জমিতে। সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে বেড়া উপজেলায়। এ উপজেলায় এক হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে। এছাড়া সদর উপজেলায় ২০০ হেক্টর, সুজানগরে ৩৫০ হেক্টর, ঈশ্বরদীতে ১৫৬ হেক্টর ও সাঁথিয়া উপজেলায় ১০ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে।
বাদামচাষিরা জানান, প্রতিবছর বর্ষায় চরাঞ্চলে বাদাম ক্ষেত তলিয়ে যায়। সেজন্য একটু আগেভাগেই বাদাম রোপণ করা হয়, যাতে পানি আসার আগেই ক্ষেত থেকে বাদাম তোলা যায়। সাধারণত আষাঢ় মাসের মধ্যেই বাদাম তোলা শেষ হয়ে থাকে।
সদর উপজেলার শুকচর, দাসপাড়া, নতুন গোহাইলবাড়ী এলাকার বেশ কয়েকজন বাদামচাষি জানান, কয়েক বছর ধরে চীনাবাদাম চাষ করছেন তারা। বাদাম লাগানোর ৯০ দিনের মধ্যে তা তোলা শুরু হয়। প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১৫ মণ বাদাম পাওয়া যায়। লাভের অঙ্ক ভালো হওয়ায় দিন দিন বাদাম আবাদের পরিধিও বাড়ছে।
সদর উপজেলার শুকচর গ্রামের কৃষক আলাল শেখ জানান, বাদাম আবাদে চরাঞ্চলসহ কিছু এলাকায় কৃষক ভালো সাফল্য পাচ্ছে, স্বাবলম্বী হয়েছেন বহু মানুষ। সদর উপজেলার আশুতোষপুর চরের কৃষক আজগর আলী জানান, তিনি এ বছর পাঁচ বিঘা জমিতে বাদাম আবাদ করেছিলেন। ফলন পেয়েছেন ১২০ মণ। অন্য ফসল আবাদের চেয়ে বাদাম আবাদে পরিশ্রম ও খরচ অনেক কম হওয়ায় লাভ হয়েছে বেশ ভালো। শুধু কৃষক আলাল শেখ নন, কৃষক আকবর আলী, মিয়া চাঁদ ও সাগর সরকারের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এ বছর তারা বাদাম আবাদ করে ভালো ফলন ও দাম পেয়েছেন।
বেড়া উপজেলার চরপেচাকোলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা জমি থেকে বাদাম তুলছেন। কৃষানি ও কিশোর-কিশোরীরা গাছ থেকে বাদাম ছাড়িয়ে স্তূপ করে রাখছেন। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্রচাষিরা জমি থেকে বাদাম হাটে নিয়ে বিক্রি করছেন। বিত্তবান চাষিরা বাদাম শুকিয়ে গোলাজাত করে রাখছেন। স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক জানান, বাদাম চাষ করে চরাঞ্চলের কয়েক হাজার কৃষক পরিবার সচ্ছল হয়েছে। দূর হয়েছে তাদের অভাব-অনটন। মলিন মুখে ফুটেছে হাসি।
আর এই বাদাম চাষকে ঘিরে বেড়া উপজেলার নাকালিয়া ও নগরবাড়িতে গড়ে উঠেছে বাদাম বিক্রির পাইকারি মোকাম ও বাদাম কারখানা। প্রতিদিন চরের কৃষকরা নৌকায় করে নাকালিয়া ও নগরবাড়ী মোকামে বাদাম বিক্রির জন্য নিয়ে যান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাদাম ব্যবসায়ীরা বাদাম কেনার জন্য এই মোকামে আসছেন। বাদাম কেনাবেচার জন্য দুটি মোকামে ২০-২২টি আড়ত গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা স্থানীয় আড়তদারের মাধ্যমে বাদাম কিনে এখান থেকে নিজ নিজ গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কিছু বড় ব্যবসায়ী বাদাম কিনে মেশিনে খোসা ছাড়িয়ে সরবরাহ করছেন দেশের বড় বড় কারখানায়।
বেড়া উপজেলার কাশিনাথপুর বাজারের পাইকারি বিক্রেতা ইদ্রিস আলী জানান, তিনি নগরবাড়ী মোকাম থেকে বাদাম কিনে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন। তিনি এই ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার মতো অনেকে নগরবাড়ী ও নাকালিয়া মোকাম থেকে বাদাম কিনে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করে তার মতো স্বাবলম্বী হয়েছেন।
ঢাকার বাদাম ব্যবসায়ী আজাহার আলী জানান, গুণগত মান ভালো হওয়ায় এ অঞ্চলের বাদামের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তিনি নগরবাড়ী ও নাকালিয়া হাট থেকে বাদাম কিনে আড়তদারের গুদামে রাখেন। পরে আড়ত থেকে নৌপথে বাদাম ঢাকায় নিয়ে বিভিন্ন চানাচুর তৈরির কারখানায় পাইকারি সরবরাহ করেন। এভাবে তিনি প্রতি সপ্তাহে ৫০০ থেকে এক হাজার মণ বাদাম ঢাকায় পাঠান।
পাবনা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক বিভূতিভূষণ সরকার জানান, জেলার চরাঞ্চলের মাটি বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষি বিভাগের কর্মীরা সব সময় কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের পরার্মশ দিয়ে থাকেন। তাদের উন্নত জাতের বাদাম চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বাদাম চাষে লাভ হওয়ায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এ অঞ্চলে বাদাম চাষ।