পারস্পরিক সহযোগিতার সুফল মিলুক বাণিজ্যে

শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথভাবে নির্মিত ‘বাংলাদেশ ভবন’র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে বক্তব্য রেখেছেন, সঙ্গত কারণেই তা গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়েছে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উভয় দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধুত্বকে অপরাপর বিশ্বের জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মডেল অভিহিত করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিকে স্বাগতই জানাতে চাইবে কূটনৈতিক পরিমণ্ডল। এদিকে ‘বাংলাদেশ ভবন’ দু’দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রতীক হয়ে উঠবে বলে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, তাও শুভেচ্ছার নির্দশন বলে বিবেচিত হবে।
খেয়াল করার বিষয়, একটা সময় পর্যন্ত ভারত সফররত বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীদের বক্তব্যে যে ধরনের রূপকের প্রাধান্য থাকত, এবার তা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। উভয় দেশ সহযোগিতার এ ধারা অব্যাহত রাখবে বলে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি তিনি এও জোর দিয়ে বলেছেন, ‘একটা প্রতিবেশী দেশ থাকলে সমস্যাও থাকতে পারে; আমরা কিন্তু সমস্যাগুলো একে একে সমাধান করে ফেলেছি… আমি আশা করি, যেকোনো সমস্যা আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের মাধ্যমেই সমাধান করতে পারব।’ দ্বিপক্ষীয় দর কষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান উত্তরণের প্রতিফলন হচ্ছে এই বলিষ্ঠতা। পাঠকদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়, সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চুক্তি সই হয়েছে চীনের একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে। এতে বেশ আগ্রহ ছিল ভারতের। তারপরও নিয়ম মেনে যেভাবে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজটি দেওয়া হয়Ñনানা বিবেচনায় তা নজিরবিহীন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজ অবস্থান শক্তিশালীকরণের সঙ্গে সঙ্গে সম্মান অর্জনে সক্ষম হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। আলোচ্য অনুষ্ঠানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও আমরা পেয়েছি সেই সম্মানের সুর। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তাদের সামাজিক খাতে যতটা অগ্রগতি করেছে, গরিব মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করতে যে কাজ করেছে, আমি স্বীকার করি এটা আমাদের প্রেরণা দিতে পারে।’ তিস্তা ইস্যুতে অনেকটাই ‘অনমনীয়’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সুর নরম করে বলেছেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক আরও অনেক অনেক ভালো হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি।’
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়, ওই অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা ইস্যু উপস্থাপন করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না মিললেও রোহিঙ্গাদের নিয়ে কথা বলা গেছে, এটা সূচনা বটে। সবাই প্রত্যাশা করেন, এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে সিরিয়াসলি আলোচনা শুরু করবে সরকার। সারা বিশ্ব যেখানে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিচলিত, সেখানে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত নিশ্চুপ থাকতে পারে না। দ্বিতীয় বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞ ও স্টেকহোল্ডাররা বারবার যে কথাগুলো বলে আসছেনÑসাংস্কৃতিক বিনিময় আরও বাড়ুক; একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও যেন উপেক্ষিত না থাকে। লক্ষণীয়, ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং সেহেতু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্যেও ক্রিয়াশীল। দুঃখজনক হলো, ভারতের পক্ষ থেকে বাণিজ্য সহজীকরণের মাত্রাটা আশানুরূপ নয়। মাঝেমধ্যেই আমাদের ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে সে ব্যাপারে নানা অভিযোগ শোনা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে পণ্যের মানদণ্ড নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের একচোখা মনোভাবের কথা। পণ্য আমদানি ও রফতানির বেলায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগও কম নেই। সবাই চাইবেন, আলোচনার ভিত্তিতে সেগুলোর সমাধান হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারত এক অপরিহার্য বন্ধু, এ বাস্তবতা যেমন স্বীকার্য; তেমনি ভারত সরকারকে অনুভব করতে হবে, গতবার যখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশটিতে যানÑতিনি গিয়েছিলেন স্বল্পোন্নত একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে আর এবার তিনি সফর করছেন একটি উন্নয়নশীল দেশের বাড়তি সম্ভাবনাসহ। দেশটির সরকার এ পরিবর্তন আমলে নেবে, তেমনটাই প্রত্যাশা।