পারিবারিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে করণীয়

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি থাকে পরবর্তী সময়ে কোনো কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ি এক দিন খুব ইচ্ছে হলো দেয়াল দিয়ে হেঁটে চলা একদল পিঁপড়ার (যাদের মুখে খাদ্যের ছোট ছোট দানা ছিল) গন্তব্য খুঁজে বের করা। খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম, গন্তব্য একটি চিনির বয়াম। রান্নাঘরে চিনির বয়ামের মুখ আলগা ছিল। তার চারপাশ পিঁপড়া দিয়ে ভর্তি। এ অবস্থায় আমি কাউকে কিছু না বলে চিনির বয়ামটি যেভাবে ছিল সেভাবেই রাখলাম। কারণ আমার মূল উদ্দেশ্য, পিঁপড়াগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করা। আমি এবার একটি পিঁপড়াকে টার্গেট করলাম যে প্রথমে ছিল, তার চলাফেরা-ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো সে-ই এদের নেতা। আমিও বাছাধনের পেছনে যাত্রা করলাম। পিঁপড়াগুলো নেতাকে অনুসরণ করে বড় দুই-তিনটি ঘর পার হয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমিও নাছোড়বান্দা। দরজা দিয়ে বের হয়ে দৌড়ে জানালার দিকে গেলাম, দেখি তখনও হাঁটছে পিঁপড়াগুলো। হাঁটতে হাঁটতে তারা ছোট্ট এক মাটির ঢিবির ভেতর ঢুকে খাবার রেখে আবার বের হচ্ছে এক লাইনে; কিন্তু সবগুলো সে নেতার পেছনেই চলছে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে। একটি অন্যটিকে ওভারটেক করছে না। মাঝেমধ্যে নেতা থেমে গেলে থেমে যায় পুরো দল। তার মানে পুরো দলটির নিয়ন্ত্রণ করছে একটি পিঁপড়া। অনেকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীব বলতে প্রথমেই পিঁপড়াকে বুঝিয়ে থাকেন। কিন্তু আমি এ ঘটনাকে দেখছি ভিন্নভাবে। যেমন সামনের নেতা পিঁপড়াটিকে অনুসরণ করে দলের সবারই বেশ কিছু বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়।

এখন আসি পরিবারের কথায়। একজন সদস্য পুরো পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এক্ষেত্রে এমন হয়, কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পরিবারের সবাই তার মুখাপেক্ষী থাকে আর তার সিদ্ধান্ত যদি ভুলও হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্য সদস্যরা চিন্তা না করেই তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করেন। এভাবে যে কোনো পরিবার জড়িয়ে পড়তে পারে বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে। প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় শাশুড়ি, জামাই, ননদ কিংবা দেবর মিলে গৃহবধূূকে হত্যা করেছে।

ধরা যাক, ছেলে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে নতুন বউ। এখন বাংলার ঘরে ঘরে হরহামেশাই দেখা যায়, মেয়েটি একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ, অপরিচিত লোকজনকে আপন করে নেয়। তাকে সেই পরিবারের লোকরাই বিভিন্নভাবে নিগৃহীত করছে। অথচ বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই একটি মেয়ের আসল ঘর হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শাশুড়ি বউমার সঙ্গে সব কথাতেই লেগে আছে, ননদ তার শশুরবাড়ি থেকে তার মাকে বিভিন্ন ধরনের কুবুদ্ধি দিচ্ছে, শ্বশুরমশাই সব দেখে না দেখার ভান করছে আর তার স্বামী মা বলতে অন্ধ। এখন একটু চিন্তা করা যাক কেন শাশুড়ি বউমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে! এর কয়েকটি অপশন হতে পারে। যেমনÑহয়তো আজ যে শাশুড়ি সে যখন কারও বউমা ছিল সে ঠিক একই ধরনের দুর্ব্যবহার পেয়েছে, যার প্রতিশোধ নিচ্ছে অথবা পাড়ার অতি উৎসাহী শাশুড়িরা যারা নিজেদের ঘর সামলাতে পারে না তারা বিভিন্ন ধরনের কুবুদ্ধি দিচ্ছে। তৃতীয়ত. হতে পারে শাশুড়ি একটু বেশি মাত্রায় ভারতীয় সিরিয়াল দেখেন আর সেখানে যে ধরনের ফ্যামিলি পলিটিকস চলে, শাশুড়ি-বউয়ের যে ধরনের ব্যবহার চলে, তা তিনি বাস্তবে প্রয়োগ করে সুখ পাচ্ছেন। বাংলাদেশে ঠিক যখন থেকে সাস বহু টাইপের সিরিয়াল শুরু হলো, শহর-গ্রামের কোটি কোটি নারী এর নেশায় মত্ত হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে আর এর কারণেই অগণিত সংসারে অশান্তি বিরাজ করছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত যে বাড়ির টিভির রিমোট নারী সদস্যের হাতে থাকে, বুঝতে হবে সেখানে অশান্তি অনিবার্য। বিনোদনের নামে যেসব সিরিয়াল চলে, যার মধ্যে ব্যভিচার ছাড়াও পারিবারিক কলহ, বিরোধের মতো বিষয়ই প্রাধান্য পায়। এ ধরনের শাশুড়িকে পিঁপড়া দলের নেতা হিসেবে ধরলে পরিবারে বাকি সদস্য সেই দলের সদস্যদের মতোই যে আচরণ করবে, তা বিস্তারিত বলার অবকাশ নেই। সেই শাশুড়ি তার সঙ্গে অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছেন। তিনি যদি একবার ভাবতেন, যখন নববধূ হয়ে প্রথম এ বাসায় এসেছিলেন সেসময়কার তার প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা তার কেমন লেগেছিল কিংবা তিনি যেমন এ পরিবারকে আপন ভেবেছিলেন। ঠিক তার পুত্রবধূর ক্ষেত্রেও তা-ই।

বাঙালি মায়েদের সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। সন্তানের জন্য তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তা পশ্চিমা দেশে বিরল। সেসব দেশে এমনও দেখা যায়, শারীরিক গঠন ঠিক রাখার জন্য শিশুদের অনেক সময় দুগ্ধপান থেকে বিরত  রাখেন মায়েরা।

কোনো কোনো গৃহবধূ নতুন সংসারে ঢোকা মাত্র সে সংসারে ফাটল ধরাতে মরিয়া হয়ে যায়। ভুলে যায় তারাও কোনো বাড়ির মেয়ে, তাদেরও পরিবার আছে। এ ধরনের মেয়েরা কখনও শ্বশুরবাড়িকে আপন করে নিতে পারে না। এর কারণÑনিজের পছন্দমতো পাত্রের সঙ্গে বিয়ে না হওয়া, পরিবার বিষয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে শিক্ষা না পাওয়া, বান্ধবীদের দ্বারা প্ররোচিত হওয়া, ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের প্রভাব প্রভৃতি। এক্ষেত্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরোনো প্রেমিকের যোগসাজশ কিংবা তাদের পরিবারের ইন্ধন থাকতে পারে। তবে মূল দায় তার।

পরিবারের কোনো সদস্যের ভুল সিদ্ধান্তে অন্যরা অন্ধের মতো সায় দিলে দুর্ঘটনা যে ঘটবে, তা নিশ্চিত। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। এক. পরিবারের একজন মানুষ কোনোভাবে ভুল সিদ্ধান্ত দিতেই পারে। বাকিদের তা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভেবে দেখতে হবে। দুই. শিশুকালেই সন্তানদের পারিবারিক মূল্যবোধ বিষয়ে ধারণা দেওয়া। তিন. বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হুট করে সিদ্ধান্ত না নেওয়া। চার. পরিবারের সদস্যের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকলেও তা যেন নির্দিষ্ট সম্পর্কের প্রতি অসম্মানজনক পরিস্থিতিতে না গড়ায়। পাঁচ. সমাজের দুষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা পরিবারের সদস্য যেন প্রভাবিত না হয়। ছয়. পরিবারে অনৈক্য সৃষ্টি করতে পারে এমন টিভি সিরিয়াল দেখা থেকে বিরত থাকা। সাত. পারিবারিক বন্ধন ঠিক রাখতে ইন-ল শব্দটি থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি।

 

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক

chanchal.songÑgmail.com