এসএমই

পাহাড়ে বাড়ছে ড্রাগন চাষ

পাহাড়ে বাড়ছে ড্রাগন চাষ। এরই মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বান্দরবানে ড্রাগনের চাষ করে লাভবান হয়েছেন বেশ কয়েকজন কৃষক। তাদেরই একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর চাষি তোয়ো ম্রো। চিম্বুক পাহাড়ের বসন্তপাড়ায় তিন একর পাহাড়ি জমিতে পাকা পিলারের পরিবর্তে ভিন্ন পদ্ধতিতে মেহগনি গাছের ওপরের অংশ কেটে ৪৬০টি গাছের গোড়ায় এক হাজার ৫৩০টি ড্রাগন চারা লাগিয়েছেন তিনি। ১৮ মাসের ব্যবধানে দুটি মৌসুমে বাগান থেকে ড্রাগন তুলেছেন তিনি। ফল বিক্রি করে আয় করেছেন প্রায় ৯ লাখ টাকা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তোয়ো ম্রো’র বাগানে উৎপাদিত ড্রাগন পাইকারি ব্যবসায়ীরা ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করছেন।
কৃষি বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বল্প সময় ও কম পরিশ্রমে অধিক লাভজনক হওয়ায় বান্দরবানের অনেক কৃষক জুম চাষ ত্যাগ করে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
পাহাড়ে বাণিজ্যিকভাবে এ ফলের চাষ করে এরই মধ্যে বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন তোয়ো ম্রো। জেলার চিম্বুক-নীলগিরি সড়কের বসন্তপাড়ায় প্রায় ২০ একর পাহাড়ের উঁচু-নিচু ঢালু জমিতে মিশ্র ফলের বাগান রয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম দফায় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দেড় একর পাহাড়ি জমিতে ৩০০ ড্রাগন চারা লাগান তিনি। সফলও হন। ছয় মাস পর বাগানে উৎপাদিত ড্রাগন বিক্রি করে আয় করেন এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। লাভজনক হওয়ায় ২০১৭ সালে ভিন্ন পদ্ধতিতে বাগানের অন্য পাশে তিন একর জমির বনজ মেহগনি গাছের ওপরের অংশ কেটে ফেলেন। পরে পাকা পিলারের পরিবর্তে কেটে ফেলা ৪৬০টি বনজ গাছের গোড়ায় ১৫৩০টি ড্রাগন ফলের চারা লাগান। এছাড়া ৫০টি পিলারের গোড়ায় ৩৩০টি ড্রাগন চারা রোপণ করেন।
তোয়ো ম্রো বলেন, বাগানে দুই হাজার ড্রাগন গাছে ফল এসেছে। এরই মধ্যে ফল বিক্রি করে চার লাখ টাকার মতো পেয়েছি। বাগানে আরও অনেক ফল রয়েছে। ছয় মাস পর্যন্ত ১৮ থেকে ২১ দিন পরপর বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করে বিক্রি করা যাবে। বাগানে লাল, সাদা, গোলাপি ও পিংক এ চার রঙের ড্রাগন উৎপন্ন হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি ড্রাগন বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। তিনি আরও বলেন, এক সময় এ অঞ্চলের মানুষ ড্রাগন কী তা জানত না। ফলটি সম্পর্কে ধারণা ছিল না অনেকের। তবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় ড্রাগনের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। আগামীতে এ ফলের চাহিদা আরও বাড়বে। আমার বাগানে উৎপাদিত ড্রাগন কিনে বিক্রির জন্য ব্যবসায়ীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম নিয়ে যাচ্ছেন।
বসন্তপাড়ার চাষি রেংরাং ম্রো বলেন, চাষি তোয়ো ম্রো হচ্ছেন পিছিয়ে পড়া ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ। তবে উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতির পথপ্রদর্শক। তার অনুপ্রেরণায় এ অঞ্চলের জুম চাষিরা বর্তমানে ড্রাগনসহ নানা ধরনের মিশ্র ফল চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। বলতে পারেন, অলাভজনক জুম চাষ ছেড়ে দিচ্ছে ম্রো চাষিরা। তোয়োর বাগান থেকে ড্রাগন চারা সংগ্রহ করে বসন্তপাড়াসহ আশেপাশের পাহাড়ি গ্রামের অনেকে ড্রাগন চাষ শুরু করেছেন।
কৃষিবিদদের মতে, ড্রাগন এক ধরনের ক্যাকটাস গাছের ফল। এ ফলের অন্য নাম ‘পিটাইয়া’। চীনে এ ফলের নাম হুয়ো লং গুয়ো, ভিয়েতনামে থানহ লং। ফলটির জš§ মধ্য আমেরিকায়। দক্ষিণ এশিয়ার মালয়েশিয়ায় ফলটির উৎপাদন শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। বর্তমানে ভিয়েতনামে ফলটি তুলনামূলক বেশি চাষ হচ্ছে। ভিয়েতনাম ছাড়া তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, চীন, ইসরাইল, অস্ট্রেলিয়ায়ও এর চাষ হয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম ড্রাগন চাষ শুরু হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক একেএম নাজমুল হক বলেন, ড্রাগন চাষ বেশ সাড়া পড়েছে বান্দরবানে। পাহাড়ে ড্রাগন চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ ফলে পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হয়। এছাড়া সেচ কম লাগায় চাষে আগ্রহী হচ্ছে পাহাড়ি কৃষক। ফলটি বিদেশি হলেও পার্বত্যাঞ্চলের জলবায়ু ও মাটিÑদুটোই ড্রাগন চাষের জন্য উপযোগী। ড্রাগন একটি লাভজনক ফল। কম পরিশ্রমে ছোট্ট জায়গার মধ্যেও এর চাষ করা সম্ভব। শখের বসে অনেকে বাড়ির ছাদ ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিসের আশেপাশে ড্রাগনের বাগান গড়ে তুলেছেন।

এম.এ. শাহরিয়ার, বান্দরবান

 

সর্বশেষ..



/* ]]> */