পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর হোক প্রশাসন

কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড় কাটা-সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশ হয়েছে, তা উদ্বেগের। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর হুমকি শুধু বাড়ছে না, হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান ফলদ ও দুষ্প্রাপ্য বনজ বৃক্ষ। ওখানকার বন উজাড় হওয়ার কারণে কিছু পশু-পাখির অস্তিত্বও হুমকিতে। স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রেও যে এর প্রভাব পড়ছে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চার উপজেলায় বিস্তৃত এ পাহাড়ের কোনো না কোনো জায়গা কাটা হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওখানকার ঐতিহাসিক নিদর্শনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। এ ক্ষতি অপূরণীয়। আমরা মনে করি, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে লালমাই-ময়নামতি পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তাহলে স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার পাশাপাশি ঐতিহাসিক নিদর্শনকেও সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যাবে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এ পাহাড় কাটার অভিযোগ পুরোনো। বর্তমানে সরকারিভাবে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ হলেও গত ৩৫ বছরে এমন সব কাজ ওখানে থেমে ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা এ কাজে যুক্ত সব সময়। স্থানীয় প্রশাসন কখনও লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এটা ঠিক কী কারণে, তা কারও অবোধগম্য হওয়ার কথা নয়। বস্তুত সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে কঠোর মনোভাব দেখানো না হলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাহাড় কাটা থেকে নিবৃত্ত করা প্রশাসনের পক্ষে কঠিন। এজন্য থাকতে হবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা। আমরা আশা করব, স্থানীয় পরিবেশ কিংবা প্রতিবেশ শুধু নয়Ñপাহাড়টির ভূতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় রেখেও এর সংরক্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে দেখানো হবে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা।
এও মনে রাখা দরকার, শুধু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে পাহাড় কাটার মতো কাজ থেকে সংশ্লিষ্টদের নিবৃত্ত করা যাবে না। এজন্য তাদের মধ্যে পাহাড়বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির পদক্ষেপও কাম্য। ওই অঞ্চলে জনসাধারণের মধ্যে এ-বিষয়ক জনসচেতনতা সৃষ্টি ও জ্ঞান বিস্তারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ রয়েছে কি না, জানা নেই। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হলে পাহাড়টি সুরক্ষার কাজ কিছুটা হলেও সহজ হবে। এ লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগ আমরা প্রত্যাশা করি। স্থানীয় জনসাধারণকে এটা বোঝানো দরকার, মাটির চাহিদা পাহাড় না কেটে অন্যভাবেও পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু অব্যাহতভাবে কাটার কারণে পাহাড়টির অস্তিত্বই বিলীন হলে পরিবেশ, প্রতিবেশ, বাস্তুসংস্থান ও ভূতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে এর যে প্রভাব পড়বে, সেটা কাটিয়ে ওঠা মুশকিল হবে। লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের বিপুল ফলদ ও বনজ বৃক্ষ, পশু-পাখি অনেক মানুষের জীবিকার উৎসও বটে। এটি হারিয়ে গেলে তাদের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন পরিস্থিতি তাদের জীবনে যোগ করবে আরও নানামাত্রিক সংকট। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তমÑকথাটা এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখা দরকার।