মত-বিশ্লেষণ

পাহাড় নদী ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যবস্থা নিন

মাহমুদুল হক আনসারী: পাহাড়, নদী ও পরিবেশ অহরহ ধ্বংস হচ্ছে। দেশে যত পাহাড় ছিল তার অস্তিত্ব এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের সব পাহাড়ি অঞ্চল এখন উজাড়। বৃহত্তর চট্টগ্রাম পাহাড়ি সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পাহাড়ি সৌন্দর্যের নগর বললে বেশি বলা হবে না। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এখন একটি পাহাড়ও তার আপন স্বকীয়তায় পাওয়া যাবে না। চট্টগ্রামের উত্তর-দক্ষিণ উপকূল ছাড়া সব এলাকায় কমবেশি উঁচু-নিচু পাহাড়ের অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানে পর্যায়ক্রমে পাহাড়গুলোর স্বকীয়তা ও অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন এসব পাহাড় ভূমিদস্যু রাঘববোয়ালদের দখলে। পাহাড়ি এলাকায় চোখ গেলেই দেখা মেলে এসব পাহাড় নানাভাবে কেটেছিঁড়ে ফেলায় পাহাড়ের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের পাদদেশে হাজার হাজার মানুষ সপরিবারে বসবাস করছে।
এসব পাহাড়ে ভূমিদস্যুদের শক্ত কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির পেছনে রাজনৈতিক শক্তি কাজ করছে। পাহাড়গুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে অহরহ বেচাবিক্রি হচ্ছে। একপক্ষ অন্যপক্ষের কাছে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করছে। সেখানে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। পাড়া-মহল্লা তৈরি হচ্ছে। মসজিদ-মন্দির, ধর্মীয় উপাসনালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সরকারি জমি ভূমি দখলের জন্য নানা ধরনের ছলচাতুরী করা হয়। এসব পাহাড় বেদখল এক দিনের কোনো কর্মসূচি নয়। যুগ যুগ ধরে এসব পাহাড়ের পেছনে ভূমিদস্যুরা সিন্ডিকেট করে বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নিন্মস্তর পর্যন্ত তাদের তদবির ও অবৈধ অর্থের লেনদেন হয়। ফলে পাহাড় উজাড় ও ছিন্নভিন্ন হলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক ও গঠনমূলক কর্মসূচির অভাবে পাহাড় রক্ষা করা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় প্রশাসন থেকে স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশাসন পাহাড় রক্ষার দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তাদের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ জনগণ দেখছে না। ফলে দেশে যে পরিমাণ পাহাড় ছিল, এখন আর সেসবের দেখা মিলবে না। চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাহাড়ের এ করুণ দশা।
পাহাড় কর্তন ও ধ্বংস জাতির জন্য ভয়াবহ একটি বিষয়। পাহাড়ের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক। পাহাড়ে জীববৈচিত্র্য ও পশুপাখির বিচরণ। পাহাড় ধ্বংস হওয়ার কারণে পশুপাখি, জীববৈচিত্র্য আশ্রয়হীন হয়ে গেছে। পাহাড়ে গাছপালা এখন আর দেখা যায় না। এসব গাছপালাও উজাড় করে ধ্বংস করা হচ্ছে। জ্বালানি ও ব্রিকফিল্ডের লাকড়ী হিসেবে এসব পাহাড়ি সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে। পাহাড় ও বনজঙ্গল রক্ষায় বনবিভাগ বিশাল একটি সেক্টর। তাঁর সামনেই দিনরাত পাহাড়ি সম্পদ উজাড় হয়ে যাচ্ছে, যা দেখেও বাস্তব পদক্ষেপ কর্তৃপক্ষের নেই। উজাড় পাহাড়, উজাড় বনজ সম্পদ যার ফলে পরিবেশ ও মানবজীবন ধ্বংসের মুখোমুখি। এসব পাহাড়-পর্বত ও গাছপালা পরিবেশের জন্য না থাকলে মানবজীবনে কী পরিমাণ ধ্বংস নেমে আসবে, সেটা কমবেশি সব সচেতন নাগরিক বোঝেন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশের যে বিরূপ কর্মকাণ্ড আমরা দেখছি, তার জন্য জনগণই দায়ী। পাহাড় ধ্বংস হওয়ার কারণে পরিবেশের উগ্রতায় তুফান আর সাইক্লোন সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিবছর কোনো না কোনো সময় বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে ও সমতলে ঘুর্ণিঝড় সাইক্লোন আঘাত করছে। এসব বৈরী আবহাওয়া দিন দিন বাড়ছে, কারণ পাহাড় ও পরিবেশ সঠিকভাবে রক্ষা না হলে কোনো অবস্থায় মানবজীবনের নিরাপদ জীবন আশা করা যায় না। পাহাড় ও জমি প্রতিনিয়ত বাড়িঘর ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের জন্য স্বকীয়তা হারানোয় পরিবেশের এ বিরূপ প্রভাব দেখা দিচ্ছে। বৈরী পরিবেশের মধ্যে যে পরিমাণ বিল্ডিং গড়ে উঠছে, সেখানেও পরিবেশের কথা রয়েছে। একই নিয়মে পাহাড় ধ্বংসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের নদীগুলো দখল হচ্ছে। নদী রক্ষায় রাষ্ট্রীয় অনেক পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চিন্তাধারা থাকলেও তার বাস্তবায়ন দেখছি না। নদী এখন নদীখেকো ভূমিদস্যুদের দখলে। নদীর দখল ও দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পরিবেশকে নিয়ে গেছে। দেশের ছোট-বড় সব নদী এখন রাঘববোয়ালদের দখলে। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড। নদীঘেঁষে মিল, কারখানা, ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠছে। এসব মিল কারখানার উচ্ছিষ্ট বর্জ্য সাগর ও নদীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ফলে সাগরের নানা প্রজাতির মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। সাগর নাব্য হারিয়ে ফেলছে। নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার অর্থ দেশ ও জাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
সময় এসেছে কঠোরভাবে পাহাড় ও নদীকে রক্ষা করার দীপ্ত শপথ নিতে হবে। আমি, আপনি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যে পাহাড়-নদীকে তার স্বকীয়তায় বাঁচিয়ে রাখতে হবে। মাদক ও জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মতো সফল অভিযান পরিচালনা করে নদী ও পাহাড়কে রক্ষা করতে হবে। নদী-পাহাড় না বাঁচলে সমাজ ও রাষ্ট্র বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পরিবেশবাদী সংগঠন থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিবেশ অধিদফতর রয়েছে। তার সামনেই পরিবেশ ও নদী-পাহাড় ধ্বংস হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন চোখ বুজেই দায়িত্ব পালন করছে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয় দিতে গিয়ে টেকনাফ-কক্সবাজারের পাহাড়-বনজঙ্গল একপ্রকার উজাড় হয়ে গেছে। তাদের পুনর্বাসন করতে গিয়ে পাহাড়ের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি আমরা ডেকে এনেছি। রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে গিয়ে বাংলাদেশের পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা ফিরে পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এভাবে পাহাড় ও নদী ধ্বংসের মহোৎসব জাতি দেখছে। এ দেখা যেন শেষ হচ্ছে না। এ পরিণতির শেষ কোথায় সেটাও বলতে পারছি না। ভয়াবহ এ খেলা থেকে পরিবেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হবে। দেশ-জাতির স্বার্থে আগামী দিনের সুন্দর সমাজ ও পৃথিবী বিনির্মাণে পাহাড়-নদী রক্ষা করতে হবে। অবৈধ দখল ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। আপন স্বকীয়তায় নদী ও পাহাড়কে ফিরিয়ে আনতে হবে। তা যদি রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষে সম্ভব হয়, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্ম সুন্দর বাংলাদেশ ফিরে পেতে পারে। পরিবেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিরাপদে বাঁচাতে হলে অবশ্যই নদী-পাহাড় রক্ষা করতে হবে। এ দায়িত্ব প্রশাসন থেকে সব সচেতন নাগরিকের। আসুন পাহাড়, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই।

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

সর্বশেষ..