সারা বাংলা

পা দিয়ে লিখেই এইচএসসিতে ‘এ’ গ্রেড

মো. শামীম কাদির, জয়পুরহাট: অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে সেটি প্রমাণ করলেন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার শিবপুর গ্রামের বিউটি খাতুন। জন্ম থেকেই দু’হাত নেই বিউটি খাতুনের। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পা দিয়ে লিখে ‘এ’ গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এর আগে জেএসসি ও এসএসসিতে পেয়েছিলেন জিপিএ ফাইভ। জীবনের সব বাধা পেরিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চান বিউটি খাতুন।
দু’হাত ছাড়াই যখন বিউটির জš§ হয়, মা-বাবার প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল, মেয়েটা স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারবে তো? পারবে তো এ কঠিন সমাজ বাস্তবতায় টিকে থাকতে? তবে যত দিন যাচ্ছে মা-বাবার কপালে থাকা সেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর ঠোঁটে ফুটে উঠছে হাসি। বিউটি নিজের ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম দিয়ে তাদের বোঝা না হয়ে ক্রমেই হয়ে উঠছেন গর্বের কারণ।
ইচ্ছ শক্তি থাকলে সব সম্ভব পা দিয়ে লিখে সেটি প্রমাণ করলেন। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অর্জন করেছেন সাফল্য। বিউটি এখন চান উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে, আত্মনির্ভরশীল হতে।
গতকাল তার বাড়িতে এ প্রতিনিধির কথা হয় বিউটির সঙ্গে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক শাখায় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে চান। তার পছন্দের তালিকায় প্রথমে আছে প্রাচ্যো অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সুযোগ পেলেও খুশি হবেন তিনি। ভবিষ্যতে তিনি শিক্ষক হতে চান। বিউটি আরও বলেন, লেখাপড়ার পেছনে তার মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। মা তার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন।
বিউটি আক্তারের জš§ ক্ষেতলাল উপজেলার শিবপুর গ্রামে। তার বাবা বায়োজিদ ও মা রহিমা বেগম। বাবা একজন দরিদ্র কৃষক। বিউটির বড় ভাই বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। তবে এখনও চাকরি পাননি। অভাবের সংসার হওয়ায় ছেলেমেয়েকে লেখাপড়ার জন্য ওই দম্পতি অনেক কষ্ট সয়েছেন।
বাবা বায়োজিদ হোসেন বলেন, মেয়ে যখন দুটি হাত ছাড়াই জন্ম নিল, তখন সত্যিকার অর্থে তাদের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। বিউটি লেখাপড়া করতে পারবে, এটা তাদের ভাবনাতেই ছিল না। শুধু চিন্তা হতো, মেয়েটা একা একা তার প্রয়োজনীয় কাজ সামলাতে পারবে তো?
মা রহিমা বেগম বলেন, বিউটির পড়া বিষয়ে কোনো চিন্তা ছিল না। কারণ, পড়তে পারলেও লেখাটাই ছিল বিউটির জন্য প্রধান সমস্যা। তিনি বলেন, প্রথমদিকে তিনি মেয়েকে পা দিয়ে লেখা শেখানোর চেষ্টা করতেন। ঘরের মেঝেতে বসিয়ে তার ডান পায়ের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল অথবা কলম ধরিয়ে দিতেন। শুরু দিকে বিউটির খুব সমস্যা হতো। তবে প্রতিনিয়ত বিউটি চেষ্টা চালিয়ে যান। একপর্যায়ে পা দিয়ে লেখা আয়ত্তে আনেন। রহিমা আরও বলেন, বিউটির অদম্য মনোবলই তাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। যতই কষ্ট হোক, তাকে উচ্চ শিক্ষিত করে তুলবেন।
ক্ষেতলালের আকলাস শিবপুর শ্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকাম উদ্দীন বলেন, বিউটি আক্তার পা দিয়ে লিখে তার বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান।
বিউটির ইচ্ছা, উচ্চতর লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে দেশ ও দশের সেবা করা। অদম্য এ মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণে সমাজের বৃত্তবানরা এগিয়ে আসবেন এমনটাই প্রত্যাশা তার পরিবারের।

সর্বশেষ..



/* ]]> */