‘পিএইচডি শেষে মাশরুম চাষাবাদ করছি’

 

শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি। লোভনীয় চাকরি। সব ছেড়ে হয়েছেন মাশরুমচাষি। পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশে আছেন স্ত্রী। আর সহায়তা জুগিয়েছে মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট। এমনই একজন ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। শেয়ার বিজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার উদ্যোগের কথা বিস্তারিত জানিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদ হাসান

 

চাকরি না করে মাশরুমচাষি হওয়ার ভাবনা কেন?

১৯৭৩ সালে ঢাকার ধামরাই উপজেলার সানোরা ইউনিয়নের চাপিল গ্রামে আমার জন্ম। বাবা ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ১৯৯৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করি। তারপর ২০১৬ সালে পিএইচডি শেষ হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি ১৯৯৮ সালে তৎকালীন সাভারের মাশরুম কালচার সেন্টারের একটি প্রকল্পে গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করি। মূলত গবেষণাকাজের মাধ্যমে মাশরুমের প্রতি ভালোলাগা, তারপর ভালোবাসা। আড়াই বছর পর প্রকল্প শেষ হলেও মাশরুমের প্রতি ভালোবাসা থেকেই যায়। এর মাঝে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছি। কিন্তু কোনোভাবেই মানাতে পারছিলাম না। এছাড়া পিছিয়ে পড়া বা বেকার মানুষের উন্নয়নে কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করি। তাই লোভনীয় চাকরির দিকে না তাকিয়ে সাধারণ মাশরুমচাষি হিসেবেই নিজের জীবন গড়ে তুলি। শুরু করি মাশরুম নিয়ে গবেষণা ও চাষাবাদ।

 

কীভাবে শুরু, কত টাকা পুঁজি ছিল?

সেই কথা মনে পড়লে আপনমনে হেসে উঠি। মাত্র এক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে মাশরুম চাষ শুরু করি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে আশুলিয়ার পানধোয়া গ্রামে একটি ভাড়াবাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকতাম, এখনও বসবাস করছি। শুরুতে বাড়ির সামনে প্রায় ৫ শতাংশ খোলা জায়গায় কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ দিয়ে স্বল্প পরিসরে চাষ শুরু করি। ধীরে ধীরে চাহিদার ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ খালি জায়গায় চাষ করি। এছাড়া বাড়ির অন্যান্য কক্ষে বীজ সংরক্ষণ ও গবেষণার কাজ চলে। এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিইনি। বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় সাত থেকে আট আট লাখ টাকা আয় করছি।

 

মাশরুম চাষে প্রেরণা পেয়েছেন কীভাবে?

পিএইচডি করেছি মাশরুম নিয়ে। ফলে গবেষণার অংশ হিসেবে রাঙামাটির বিভিন্ন পাহাড়ে মাশরুম খুঁজে ফিরেছি, গবেষণা করেছি। তখন থেকেই মাশরুমের প্রতি দুর্বলতা ও প্রেরণা কাজ করছে। তবে মূল প্রেরণা হিসেবে রয়েছেন আমার শিক্ষক সাবেক কৃষি কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ স্যার। তার মাধ্যমেই মাশরুমের ধারণা পাই। তারপর বলতে গেলে আমার স্ত্রী লিনা খানমের সহযোগিতা ও প্রেরণা না পেলে হয়তো এত দূর আসতে পারতাম না। লিনা নিজেও স্নাতক। আমরা কাজটাকে কখনও ছোট করে দেখিনি।

 

কতজন চাষি আপনার বীজ কিনছেন বা কাজ করছেন?

প্রথমে আমি ও আমার স্ত্রীএ দুজনই ছিলাম। এখন চাষাবাদের জন্য দুজন কর্মী রয়েছেন। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রতিদিন পাঁচজন শিক্ষার্থী কাজ করছেন। শিক্ষার্থীরা তাদের অবসর সময়ে এখানে আসেন। তারা মাশরুম বিষয়ে জানতে পারছেন। আবার সময়টা কাজে লাগিয়ে বাড়তি কিছু আয়ও করছেন। বর্তমানে এখানে দেড় শতাধিক চাষি রয়েছেন, যারা আমার কাছ থেকে মাশরুমের বীজ কিনছেন।

 

সাধারণ মানুষ কীভাবে উপকৃত হচ্ছেন?

মাশরুম পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি খাবার। পরিবারের সবার এ থেকে পুষ্টি পূরণ হচ্ছে। চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করে ভালো আয়ও করছেন অনেকে।

মাশরুম চাষে বাড়তি জায়গার প্রয়োজন হয় না। পুঁজিও বেশি লাগে না। নারীরা সহজেই মাশরুম চাষ করতে পারেন। আমার এখান থেকেই ধারণা নিয়ে অনেক নারী মাশরুম চাষ করে বাড়তি আয় করছেন। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন। একই সঙ্গে অনেক বেকার মাশরুম চাষ করে এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। সরকার বিভিন্ন জাতের মাশরুম উৎপাদনে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। তবে বিদেশি নিন্মমানের প্রক্রিয়াজাত করা মাশরুমের ব্যবহার বাড়ছে। নিন্মমানের এজন্যই বললাম, চীন গ্রেডিং করেই তার মাশরুমটা আমাদের দেশে বিপণন করে। এ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই, আমাদের দেশেও বাটন মাশরুম উৎপন্ন হচ্ছে, যা আমদানি করা প্রক্রিয়াজাত বাটন মাশরুমের চেয়ে অধিক মানসম্মত। তবে উৎপাদন অল্প হওয়ায় আমরা বাজারটা ধরতে পারছি না। তবে শিগগির আমাদের উদ্যোক্তারা শীত মৌসুমে এ মাশরুম উৎপাদন করতে পারবেন।

 

মাশরুম নিয়ে গবেষণা বা চাষাবাদ করতে গিয়ে কী কী সমস্যায় পড়েছেন?

প্রধান সমস্যা জীবাণু সংক্রমণ। আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সময়ে জীবাণু সংক্রমণ হয় বেশি। মাশরুম চাষের জন্য পাহাড়ি অঞ্চল বেশি উপযোগী। ফলে সমতলে মাশরুম চাষাবাদ চ্যালেঞ্জের। অন্যদিকে আমাদের দেশে এখনও সেভাবে বাজার গড়ে ওঠেনি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের ভাবনায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমি পিএইচডি শেষে ভালো চাকরি না করে মাশরুম নিয়ে চাষাবাদ বা গবেষণা করছি, এ বিষয়টা স্বজন বা সমাজের অনেকে বাঁকা চোখে দেখছেন। সমালোচনাও করছেন। এছাড়া মাশরুম বিক্রির জন্য প্রচার-প্রচারণার অভাব রয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান মাশরুম উৎপাদনে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাশরুম একসময় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয় হলেও এখন মানুষ কিছুটা সচেতন, অনেকেই এখন মাশরুম খাচ্ছেন। এ কথা সত্য, মাশরুম ফুটপাতের ফ্রাই-শপ থেকে শুরু করে চায়নিজ রেস্টুরেন্ট ও পাঁচতারা হোটেলেও পাওয়া যায়। তবে পরিবারের সবাই পছন্দ না করলে সেটি রান্নাঘরে ঢুকতে পারে না। অন্যদিকে চায়নিজ রেস্টুরেন্টগুলো আমদানি করা বাটন মাশরুমের জোগানের ওপর নির্ভরশীল। অন্যান্য মাশরুম বা মাশরুমজাত পণ্যের আমদানিও বাড়ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এ আমদানি থাকবে। তবে আমদানি করা মাশরুমের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশজ মাশরুমের ব্যবহার নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। ভিনদেশি বাটন দিয়ে যেসব খাবার তৈরি করা যায় আমাদের দেশজ মাশরুম দিয়েও সেই খাবার তৈরি করা যায়।

আপনার গবেষণায় প্রযুক্তির সমন্বয় মাশরুমের নতুন কী কী জাত যুক্ত হয়েছে?

আগে মাশরুম চাষাবাদে সনাতন পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। এখন পরিবর্তন এসেছে। চাষাবাদের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির নানা ব্যবহার হচ্ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা ও পুষ্টিজ্ঞানের বিষয় তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আমি বিদেশি চাষি ও গবেষকদের সঙ্গে ইউটিউবে বা ভিডিও কলের মাধ্যমে পরামর্শ ও তথ্য আদান-প্রদান করি। এখন পর্যন্ত আমি ১০টি মাশরুমের জাত উদ্ভাবন করেছি। রাঙামাটি ঘুরে মিলকি, সেগী, ওয়েস্টার (নতুন দুই জাত), স্ট্র, গ্যানোডার্মা (চারটি জাত) ও কোরিওলার ইত্যাদি মাশরুমের জাত খুঁজে পেয়েছি।

 

নতুন গবেষক বা উদ্যোক্তার জন্য কী পরামর্শ দিতে চান?

যে বিষয় নিয়ে চাষাবাদ বা গবেষণা করতে চান না কেন, সে বিষয়ের ওপর পড়ালেখা করুন। বিদেশি অনেক চাষির সঙ্গে কথা হয়। অবাক করার বিষয় হলো, তারা যে বিষয় নিয়ে চাষাবাদ করছেন, সে বিষয়ে প্রচুর জানেন। প্রতিনিয়ত জানার চেষ্টা করেন। কীভাবে আরও ভালো করা যায়? কী কী বিষয়ে জানার ঘাটতি রয়েছে? এগুলো নিয়েও ঘাঁটাঘাঁটি করেন। বর্তমানে অনেকে চাকরি করতে চান না, উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী। তাদের পরিশ্রমী হতে হবে। জানার আগ্রহ থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, কাজকে ছোট করে দেখা যাবে না।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

ভবিষ্যতে গ্রামের বাড়ি ধামরাইয়ে বড় পরিসরে মাশরুমের চাষাবাদ ও গবেষণাগার করার ইচ্ছা রয়েছে। একই সঙ্গে মাশরুমের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে গবেষণা চালিয়ে যাবো। স্বপ্ন দেখি, সারা দেশে মাশরুমের বাজার তৈরি হবে। জেলায় জেলায় চাষিদের মাধ্যমে সমবায় গঠন করা হবে। যেখানে তারা সহজেই মাশরুম বিষয়ে পরামর্শ পাবেন ও উৎপাদিত মাশরুম বিক্রি করতে পারবেন। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মাশরুমকে নতুনভাবে তুলে ধরবো।