পিডিবির লোকসানের ৯৫% যাবে বেসরকারি খাতে

চলতি অর্থবছর

ইসমাইল আলী: ২০০৯ সালের পর থেকে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এজন্য প্রতি বছর উৎপাদনে আসছে বেসরকারি খাতের নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের বড় অংশই ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। এতে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। চলতি অর্থবছর তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছর পিডিবির লোকসানের প্রায় ৯৫ শতাংশই গুনতে হবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য। মাত্র পাঁচ শতাংশ লোকসান গুনতে হবে পিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও অন্যান্য খাতের জন্য। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার পিডিবির অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ভর্তুকি চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটি।
বৈঠকে জানানো হয়, নতুন বেশ কয়েকটি তেলভিত্তিক কেন্দ্র উৎপাদনে আসায় চলতি অর্থবছর বেসরকারি খাতের ওপর বিদ্যুৎ খাতের নির্ভরশীলতা বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বগতি ও ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় বাড়বে। আবার গ্যাসের সরবরাহ আশানুরূপ না বাড়ায় পুরনো দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক বেশ কিছু কেন্দ্রও তেলে চালাতে হবে। ফলে এ খাতে লোকসান গত অর্থবছরের চেয়ে বাড়বে।
২০১৭-১৮ অর্থবছর বিদ্যুৎ খাতের ৯ হাজার ৩১০ কোটি ১৫ লাখ টাকা রেকর্ড লোকসান গুনেছিল পিডিবি। চলতি অর্থবছর তা দাঁড়াতে পারে ৯ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য লোকসান গুনতে হবে আট হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পিডিবির লোকসানের মধ্যে ৯৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ গুনতে হবে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য।
জানতে চাইলে পিডিবির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক পরিচালক) মো. কাওসার আমীর আলী শেয়ার বিজকে বলেন, পিডিবির লোকসানের মূল কারণ বেসরকারি খাতের বিশেষত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। এজন্য গত কয়েক বছর ধরেই ভর্তুকি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হচ্ছে। গত অর্থবছর প্রথমবারের মতো ৯৫৬ কোটি ২০ লাখ ভর্তুকি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরও এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। এজন্য পিডিবির লোকসানের কারণগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণ করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।
পিডিবির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছর পিডিবির সর্বোচ্চ লোকসান ছিল জুলাই মাসে এক হাজার ৪০১ কোটি টাকা। পরের মাসে তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে তা আরও কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে এক হাজার ৪০ কোটি ও ৬৩৫ কোটি টাকা। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ শুরু হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কিছুটা বাড়ায় অক্টোবরে লোকসান কমে আসে। গ্যাসের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে আগামী আট মাসেও লোকসানের এ নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে বলে বৈঠকে জানায় পিডিবি। তবে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় লোকসান খুব বেশি কমবে না। বরং আগামী মার্চ থেকে তা দ্রুত বাড়বে।

এদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চার হাজার ৪৩৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল পিডিবি। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসান ছিল তিন হাজার ৮৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সাত হাজার ২৮২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ছয় হাজার ৮০৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত পাঁচ অর্থবছরে পিডিবি লোকসান গুনেছে ৩১ হাজার ৭১১ কোটি চার লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিডিবির লোকসানের অন্যতম কারণ বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ কেনার পরিমাণ বৃদ্ধি। কারণ বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় প্রতি বছর বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়। এক্ষেত্রে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ না কিনলেও এ চার্জ পরিশোধ করতে হয়।
এর বাইরে বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকলে বছরে অন্তত ৩০ দিনের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হবে। আবার তিন বছর পরপর বড় ধরনের ওভারহোলিংয়ের জন্য ১২০ দিন বন্ধ থাকলেও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয় পিডিবিকে।
তথ্যমতে, ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ২৪ হাজার ৯৬১ কোটি ৯৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয় ১১ হাজার ২০০ কোটি চার লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। আর এজন্য পিডিবিকে বেসরকারি খাতে পরিশোধ করতে হয় ৭৪ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২৬ হাজার ৭৬১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
গত অর্থবছর পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয় ছয় হাজার ২৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয় পাঁচ হাজার ৭৬৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৩৭৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চার হাজার ৬৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চার হাজার ৭১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।