পুঁজিবাজারেও গুরুত্বারোপ যেন থাকে

বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত সর্বাধিক বাজেট উপস্থাপনকারী হিসেবে শুধু নয় আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নাম বোধকরি লেখা থাকবে সাম্প্রতিক সময়ে চমকপ্রদ বাজেট উপস্থাপনকারী হিসেবেও। খেয়াল করার বিষয়, এমনকি নিন্দুকদের বক্তব্যের তোয়াক্কা না করে একেবারে শুরু থেকেই আকারে বৃহৎ থেকে আরও বৃহৎ বাজেট দিয়ে আসছেন তিনি। প্রথম প্রথম এর সমালোচনা যে হয়নি, তা নয়। সেগুলো ছিল মূলত ঘাটতি অর্থায়ন নিয়ে। সে যুক্তি ধোপে টেকেনি তেমন; নিন্দুকরা বৃহৎ ঘাটতি বাজেটের বিরুদ্ধে যেমন জোরালো অবস্থান গড়ে তুলতে পারেননি। এতদিনে অর্থমন্ত্রী বরং একটা দিক মোটামুটি প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন যে, প্রবৃদ্ধির স্বার্থেই ক্রমাগতভাবে আমাদের বাজেটের আকার বাড়ানো দরকার। তার সুফল মেলেনি, সে কথাও বলা যাবে না। বরং একটি স্বল্পোন্নত দেশের বাজেট থেকে এখন ক্রমবিবর্তিত উন্নয়নশীল দেশের বাজেট পেশ হচ্ছে তার হাত ধরে। এ কৃতিত্বের দাবিদার সংশ্লিষ্ট সবার হলেও এখানে অর্থমন্ত্রীর প্রতীকী গুরুত্ব কম নয়। উপরন্তু তার মন্ত্রীত্বকালে ঘাটতি অর্থায়ন থেকে বাজেট সম্পর্কিত আলোচনা এখন নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা না করা, করপোরেট করের হ্রাস-বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয় ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে; সেটাও এক ধরনের গুণগত পরিবর্তন বলতে হবে। সেজন্য অর্থমন্ত্রী তথা সরকার কিছু প্রশংসা পেতেই পারেন।
লক্ষণীয়, হালে বাজেট ও বাজেট আলোচনায় কিছু উত্তরণ ঘটলেও প্রকৃতিগতভাবে বাজেট নিয়ে সমালোচনার আমূল পরিবর্তন হয়েছে, এমনটি হলফ করে বলা যায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে যেখানে মূল আলোচনা ছিল ঘাটতি অর্থায়ন নিয়ে; এখন সেখানে সমালোচনা বেশি শোনা যাচ্ছে বাজেট বাস্তবায়ন ঘিরে এবং এটি নিতান্ত অমূলক, এ কথা নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং সার্বিকভাবে বাজেট বিশেষত উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে সরকারি খাতের ‘সক্ষমতা’ বৃদ্ধি পেলেও অনেকের অভিযোগÑএডিপি বাস্তবায়নে বাড়ছে না দক্ষতা ও এর গুণগত মান। ভালো পারফরম্যান্স দেখা যাচ্ছে না রাজস্ব আহরণেও। অনেকের মনে বরং সংশয়Ñআসছে নির্বাচনি অর্থবছরে নতুন ভ্যাট আইনের অংশবিশেষ বাস্তবায়নের মতো ঝুঁকিও নেবে কি না সরকার। অবশ্য এসব নতুন পরিবর্তন বাদ দিলেও আয়কর আহরণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেকের মনে; প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ কোম্পানিগুলো বাদ দিয়ে কেবল ব্যাংক খাতের করপোরেট কর হার হ্রাসের সম্ভাবনা নিয়েও। পাঠকরা নিশ্চয়ই লক্ষ করে থাকবেন, প্রতিবারই বাজেট ঘিরে সাধারণ মানুষের কৌতূহল থাকে কোন কোন সেবা বা পণ্যের দাম বাড়ছে এবং কোন কোন সেবা বা পণ্যের দাম কমছে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করে থাকেন বাজেটটি যৌক্তিক, বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক কি না। এবার ব্যাংকের বেলায় করপোরেট কর হার হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রতি জনগণের আগ্রহ স্বভাবতই থাকবে। কেননা সাম্প্রতিককালে মুনাফা অর্জন ব্যতিরেকে ব্যাংক খাতের যে পারফরম্যান্স, তার ওপর এদের কর হারেও ছাড় দেওয়া হলে সেটি অনেককে হতাশ করতে পারে। আমরা অবশ্য বিষয়টিকে ওভাবে দেখতে চাই না। বরং ব্যাংক খাত বৃহত্তর অর্থনীতি এবং পুঁজিবাজারের অন্যতম ভিত্তি। তাই এর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক হলে করহার হ্রাস নিয়ে আপত্তি তোলাও কঠিন। তবে নিশ্চিত করতে হবে, কৌশলটি যেন সুফল দেয়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, পুঁজিবাজার এখনও পুরো ‘স্বাভাবিক’ নয়। এমনিতেই বাজারটি স্পর্শকাতর; তদুপরি এর ওপর জাতীয় নির্বাচনের হাওয়ার প্রভাব না থেকে পারে না। এ অবস্থায় অর্থনীতির তাৎপর্যবহ এ অংশটিকে স্থিতিশীল করে স্বাভাবিক ধারায় রাখতে আসছে বাজেটে গুরুত্বারোপ করা হবে, এমনটাই প্রত্যাশা।