পুঁজিবাজারে অনুপস্থিত সিমেন্ট খাতের শীর্ষ চার কোম্পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের সিমেন্ট। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি হচ্ছে বিদেশেও। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ভালো হওয়ায় দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা প্রচুর বিনিয়োগ করেছেন। সর্বত্রই প্রতিনিয়ত বাড়ছে সিমেন্টের ব্যবহার। এ খাতের শীর্ষ ১০ কোম্পানির মার্কেট শেয়ার ৭৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। যদিও এদের অর্ধেকই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এমনকি শীর্ষ চারটি সিমেন্ট কোম্পানির মধ্যে একটিও নেই পুঁজিবাজারে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় মার্চেন্ট ব্যাংক লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টের সর্বশেষ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্কেট অংশীদারিত্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে শাহ সিমেন্ট। কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ার ১৪ শতাংশ। এরপরে মোট মার্কেট শেয়ারের ১০ শতাংশ দখলে রয়েছে বসুন্ধরা সিমেন্টের। তৃতীয় স্থানে রয়েছে সেভেন রিংস সিমেন্ট। কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ার রয়েছে আট শতাংশ। সাত দশমিক ৫০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার ধারণ করে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ফ্রেশ সিমেন্ট। শীর্ষ এ চারটি কোম্পানির একটিও পুঁজিবাজারে নেই।

মার্কেট শেয়ারে পঞ্চম স্থানে রয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ার সাত শতাংশ। সিমেন্ট বিক্রি করে মার্কেট শেয়ারে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে প্রিমিয়ার শেয়ার। ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ার ছয় দশমিক ৯০ শতাংশ। এরপরে রয়েছে এমআই সিমেন্ট (ক্রাউন সিমেন্ট)। ২০১১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ার ছয় দশমিক ৭০ শতাংশ।

মার্কেট শেয়ারে অষ্টম স্থানে রয়েছে লাফার্জ সিমেন্ট। বহুজাতিক এ কোম্পানিটির সিমেন্ট খাতের মার্কেট শেয়ার রয়েছে পাঁচ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর পরের স্থানেই রয়েছে হোলসিম সিমেন্ট। সম্প্রতি লাফার্জ ও হোলসিম একীভূতকরণ হয়েছে। মার্কেট শেয়ারে দশম স্থানে রয়েছে আকিজ সিমেন্ট। মোট মার্কেটের চার দশমিক ৩০ শতাংশ রয়েছে পুঁজিবাজারে বহির্ভূত এ কোম্পানিটির দখলে।

খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে সিমেন্ট খাতে দেশি-বিদেশি কারখানা রয়েছে ৩৩টি। এসব কোম্পানির মোট উৎপাদনক্ষমতা বছরে প্রায় তিন কোটি টন। তবে বছরে সোয়া দুই কোটি টন সিমেন্ট উৎপাদিত হচ্ছে, যা প্রায় উৎপাদন সক্ষমতার ৭৫ শতাংশ। আর বাজার শেয়ারের স্থানীয় কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে ৭০ শতাংশ, বাকি ৩০ শতাংশ এখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের সিমেন্টের বাজারে আধিপত্যের শীর্ষে রয়েছে দেশীয় কোম্পানি শাহ্ সিমেন্ট। বাজার দখলের দিক দিয়ে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির মধ্যে একটিমাত্র কোম্পানি রয়েছে বিদেশি। মাত্র সাত শতাংশ বাজার দখল করে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট।

জানা গেছে, গত ৯ বছরে সিমেন্ট খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক তিন শতাংশ। এখন দেশে মাথাপিছু সিমেন্ট ব্যবহার হচ্ছে ১২৪ কেজি, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা কম। দিন দিন সিমেন্টের ব্যবহার বাড়লেও কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, দেশে বাড়তি চাহিদা তৈরি ও রফতানির আশায় সিমেন্ট খাতে অনেক বড় বড় বিনিয়োগ হয়েছিল। ফলে দেশের মোট সিমেন্ট উৎপাদন ক্ষমতা ৩৯ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। আবাসন খাতের স্থবিরতা এবং সরকারি কিছু বড় প্রকল্প বাদে অন্য কাজে গতি না থাকায় সিমেন্টের ৩৮ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

তারা আরও জানান, পাঁচ বছর আগেও প্রায় ৭০টি সিমেন্ট কারখানা ছিল। এর মধ্যে ৩৩টিতে উৎপাদন চলছে। তাও উৎপাদন সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে না। এদিকে বাজার শেয়ারের স্থানীয় কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে ৭০ শতাংশ, বাকি ৩০ শতাংশ এখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে।

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটি রফতানির সুযোগ রয়েছে। তবে তা উšে§াচন করা সম্ভব হচ্ছে না নানা কারণে। এর মধ্যে অন্যতম পণ্য পরিবহন ব্যয়। এটা বেশি হওয়ায় ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। আবার মিয়ানমারে রফতানি সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে একই কারণে।

এদিকে সিমেন্ট খাতে যেসব কোম্পানি শীর্ষ স্থানে রয়েছে, তাদের অধিকাংশই নেই পুঁজিবাজারে। তালিকাভুক্তিতে নেই কোনো আগ্রহ। তবে বসুন্ধরা সিমেন্ট পুঁজিবাজারে আসতে পারে বলে আভাস দেন গ্রুপের কোম্পানি সচিব নাসিমুল হাই। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের মেঘনা সিমেন্ট ইতোমধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। শেয়ারহোল্ডারদের ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছে মেঘনা সিমেন্ট। বসুন্ধরা পেপারকে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী এক-দেড় বছরের মধ্যে বসুন্ধরা পেপার তালিকাভুক্ত হবে। এটি তালিকাভুক্ত হলে আগামীতে বসুন্ধরা সিমেন্ট কোম্পানিও পুঁজিবাজারে আসবে।

এদিকে দেশের পুঁজিবাজারে সিমেন্ট খাতে তালিকাভুক্ত সাতটি কোম্পানির মধ্যে দুটি বহুজাতিক। এসব কোম্পানির মধ্যে অধিকাংশ দেশীয় কোম্পানির আয় বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পে দেশীয় সিমেন্টের চাহিদা বাড়ছে। এছাড়া ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণেও বাড়ছে দেশীয় সিমেন্টের ব্যবহার।

নাসিমুল হাই বলেন, দেশের পাকা রাস্তাগুলো বিটুমিনের পরিবর্তে আরসিসি করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এটা করা হলে সিমেন্টের ব্যবহার বহুগুণ বাড়বে। ফলে এ খাতের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিও বাড়বে।