পুঁজিবাজারে আসছে সেম রেডিমিক্স

দেশের স্থাপনা নির্মাণ এখন অনেকটাই রেডিমিক্স কংক্রিটনির্ভর। পরিবেশবান্ধব, সময় সাশ্রয়ী ও টেকসই বিবেচনায় নির্মাতাদের কাছে এটি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য। ঊর্ধ্বমুখী বাজার চাহিদায় কয়েক বছরে এ খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে কয়েকগুণ। চট্টগ্রামভিত্তিক কোম্পানি সেম রেডিমিক্স লিমিটেড বর্তমানে নির্মাণশিল্পে কংক্রিট সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। এ নিয়ে শেয়ার বিজের সঙ্গে আলাপ করেন কোম্পানির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা প্রকৌশলী সনজীব কুমার দাশ। সাক্ষাৎকার গ্রহণে সাইফুল আলম

শেয়ার বিজ: বর্তমানে দেশে রেডিমিক্স কংক্রিটের ব্যবসা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই

সনজীব কুমার দাশ: দেশে বাণিজ্যিকভাবে রেডিমিক্স কংক্রিটের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৯০ সালে। আর চট্টগ্রামে শুরু হয় ২০০৪ সালে। আমাদের কোম্পানি সেম রেডিমিক্স এক্ষেত্রে পাইওনিয়র। স্থাপনা নির্মাণে এখন অনেকটাই রেডিমিক্স কংক্রিটনির্ভর। পরিবেশবান্ধব, সময় সাশ্রয়ী ও টেকসই বিবেচনায় নির্মাতাদের কাছে এটি আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঊর্ধ্বমুখী বাজার চাহিদায় গত কয়েক বছরে এ খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে বহুগুণ। আর বর্তমানে এ খাতে বিনিয়োগ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। নজরদারি না থাকায় যে কেউই রেডিমিক্স কংক্রিট তৈরির প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। ফলে মানের বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়েছে। এতে মানহীন কংক্রিটে গড়ে ওঠা স্থাপনায় নতুন ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে।

শেয়ার বিজ: আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বলুন-

সনজীব কুমার দাশ: সেম রেডিমিক্স কংক্রিট চট্টগ্রামে একটি স্বনামধন্য রেডিমিক্স কংক্রিট কোম্পানি। চট্টগ্রামে বেশিরভাগ বহুতল ভবন ও বড় প্রকল্প (মেগা স্ট্রাকচার) সেম রেডিমিক্স কংক্রিট দিয়ে গড়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে সর্বোচ্চ ৩৮ তলা বিশিষ্ট আজিজ কোর্ট বিল্ডিং সেম কংক্রিট দ্বারা নির্মিত। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আমরা স্বল্প সময়ে বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট যেমন- সানমার প্রোপার্টিজের মেগা প্রজেক্ট সানমার গ্রিন পার্কে ৩৬ ঘণ্টায় ৪৫ হাজার সিএফটি, মেরিডিয়ান নোভোটেল হোটেলে ৩০ ঘণ্টায় ৩৮ হাজার সিএফটি ও ওয়াসার রিজারভার প্রজেক্টে (জাইকার অর্থায়নে) ২০ ঘণ্টায় ২৬ হাজার সিএফটি সরবরাহ করা হয়। এছাড়া বঙ্গবন্ধু ভূ-উপগ্রহের (বেতবুনিয়া) মতো মেগা প্রজেক্টে অতি দ্রুত সময়ে কংক্রিট সরবরাহ সম্পন্ন করা হয়েছে। আমরা উৎপাদন থেকে সরবরাহ প্রতিটি পর্যায়ে সঠিকভাবে মান নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট থাকি। আর আমরাই সিয়াম ইলেক্ট্র্রনিক কংক্রিট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নামে বেচিং প্লান্ট কন্ট্রোল সিস্টেম ব্যবহার করি, যার মাধ্যমে অর্ডার ম্যানেজমেন্ট, কাঁচামাল সরবরাহ, ফিনিশড প্রোডাক্ট, ইনভেনটরি, ডিসপাস, ল্যাবরেটরি এবং চালান প্রভৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত।

শেয়ার বিজ: রেডিমিক্স কংক্রিট উৎপাদনে আপনাদের মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কেমন?

সনজীব কুমার দাশ : রেডিমিক্স কংক্রিট উৎপাদনে মান নিয়ন্ত্রণ আমাদের অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এটি আমরা তিনটি সুবিধাজনক ক্ষেত্রে ভাগ করে থাকি। প্রথমত, উৎপাদনের পূর্ববর্তী মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কংক্রিটের কাঁচামাল যেমন- পাথর, সিমেন্ট, বালি, পানি ও অ্যাডমিক্সার এসিআই কোড অনুযায়ী পরীক্ষা করার পর ক্রয় সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট জায়গায় স্টোরেজ করা হয়, এরপর কোড অনুসারে মিক্স ডিজাইন করার পর নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে ওই ডিজাইনগুলো পরীক্ষা করে কংক্রিটের প্রয়োজনীয় স্ট্রেন্থ পাওয়ার পর গ্রাহকদের সরবরাহ করা হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের মধ্যবর্তী মান নিয়ন্ত্রণ পর্যায়ে মিক্স ডিজাইন অনুযায়ী মিশ্রণের পর নিজস্ব ওজন মাপক যন্ত্র দিয়ে বেইস ডেটা ও ওজন পরীক্ষা করা হয়। অভিজ্ঞ কংক্রিট প্রকৌশলীরা উক্ত মিশ্রণের কোড অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার জন্য। তৃতীয়ত, উৎপাদনের পরবর্তী মান নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে সংরক্ষিত কংক্রিটের নমুনাগুলো কোড অনুসারে বুয়েট, এমআইএসটি, চুয়েটের ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করা হয় এবং কংক্রিটের শক্তি অনুযায়ী স্ট্রেন্থ অর্জিত হয়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের অভিযোগ অথবা উপরোক্ত প্রক্রিয়ার কোনো অপূর্ণতা থাকলে তা নির্ণয় করে সংশোধন করা হয়।

শেয়ার বিজ: কংক্রিট মিক্স ডিজাইন কেমন হওয়া উচিত?

সনজীব কুমার দাশ : প্রায় সব স্থাপনায় কংক্রিট একটি বিরাট অংশ। দেশে তৈরি সিমেন্টের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সিমেন্ট কংক্রিট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কংক্রিটের শক্তিনির্ভর করে মিক্স ডিজাইন, সিমেন্ট, পাথর ও বালি এবং পানির গুণগতমানের ওপর। চট্টগ্রামে বেশিরভাগ স্থাপনা তৈরি করতে রেডিমিক্স কংক্রিট ব্যবহৃত হয়। কংক্রিট তৈরি থেকে সাইটে ব্যবহার করার আগে পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু যানযটের কারণে এ সময়টি ঠিক রাখা যায় না, তাই কংক্রিট মিক্স ডিজাইনের সময় এ বিষয়টি যথাযথভাবে মনে রাখতে হয়। এছাড়া কংক্রিটে ব্যবহৃত পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহৃত পানির বিভিন্ন উপাদান যেমন- সোডিয়াম ক্লোরাইড (লবণাক্ততা), আয়রন ইত্যাদির জন্যও পানি ও সিমেন্টের বন্ধন দৃঢ় হয় না। এ কারণে স্থাপনা তৈরির বছর খানেক মধ্যেই ছোট ছোট ফাটল দেখা যায়।

শেয়ার বিজ: ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য আপনার কী পরিকল্পনা?

সনজীব কুমার দাশ: বর্তমানে আমাদের প্লান্টে রেডিমিক্স উৎপাদন হচ্ছে প্রায় বছরে ১৫ লাখ সিএফটি। যা ২০১২ সালে ছিল ছয় লাখ সিএফটি। আর আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ লাখ সিএফটি। বর্তমানে যে হারে দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটছে এবং ভৌতকাঠামো নির্মাণ বৃদ্ধির কারণে রেডিমিক্স কংক্রিট সরবরাহকারী ও প্রস্তুতকারীর চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে এতে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার একর জমির ওপর একটি শিল্প শহর গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ শিল্প শহরের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর, কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি শোধনাগার, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, ট্যুরিজম পার্ক, লেক, খেলাধুলার মাঠ, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও হাসপাতাল ইত্যাদি হবে। এসব পরিকল্পনায় নির্মাণ সহায়ক ভূমিকা পালনে আমরা সীতাকুণ্ড এলাকায় আরেকটি প্ল্যান্ট স্থাপন করতে যাচ্ছি। এটিতে বিনিয়োগ হবে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। এতে তিন শতাধিক কর্মসংস্থান হবে। আর এ প্লান্ট হতে প্রতি মাস সাড়ে চার লাখ সিএফটি পর্যন্ত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব হবে। যা ২০১৯ সালের পুরোপুরিভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসবে।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারের অন্তর্ভুক্ত হওয়া পরিকল্পনা আছে কি?

সনজীব কুমার দাশ : দেশের পুঁজিবাজারে আসার জন্য আমরা এর মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করেছি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের দিকে আমরা পুঁজিবাজারের অন্তর্ভুক্ত হব। কারণ শিল্পে অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই।

শেয়ার বিজ: ধন্যবাদ আপনাকে।

সনজীব কুমার দাশ : আপনাকেও ধন্যবাদ।