পুঁজিবাজারে দৌরাত্ম্য কমছে বিতর্কিত কোম্পানির

মৌলভিত্তি শেয়ারের লেনদেন বৃদ্ধি

শেখ আবু তালেব: প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সক্রিয় হওয়ায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) শেয়ার লেনদেন বৃদ্ধি পাচ্ছে গত ১৭ কার্যদিবস ধরে। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত সপ্তাহের পুরো সময়ে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে আগ্রহ বেড়েছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে বিতর্কিত কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির প্রবণতা আগের চেয়ে কমেছে গত সপ্তাহে। এতে স্বল্প মূলধনি বিতর্কিত কোম্পানির শেয়ার নিয়ে যে দৌরাত্ম্য ছিল তা কমতে শুরু করেছে।
বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাজারে ভালো শেয়ারের পরিমাণ বেশি হলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন না। এ বিষয়ে সম্প্রতি পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেছিলেন, বাজারে ভালো মানের শেয়ারের পরিমাণ যত বৃদ্ধি পাবে, কারসাজিও ততো কমে যাবে। ভালো শেয়ার বেশি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করেন। আর স্বল্প মূলধনি কোম্পানির শেয়ারেই কারসাজি বেশি হয়।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত ১৯ জুন লেনদেন হয় ৬৩৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর ১৭ কার্যদিবস পরে সর্বশেষ ১২ জুলাই লেনদেন হয় ৮৫২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। গত সপ্তাহের পুরো সময়টা জুড়েই লেনদেন ৮০০ কোটির ওপরেই ছিল। অবশ্য গত ১১ জুলাই সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল এক হাজার ১১৫ কোটি ২৯ লাখ টাকার।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে ‘এ’ ক্যাটেগরির শেয়ারের লেনদেন আগের সপ্তাহের চেয়ে ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই সময়ে ডিএসইর মোট লেনদেনের ৮৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ ছিল ‘এ’ ক্যাটেগরির। গত সপ্তাহে ‘এ’ ক্যাটেগরির শেয়ারের লেনদেন হয়েছে চার হাজার ৩০৬ কোটি টাকার বেশি; যা আগের সপ্তাহে ছিল দুই হাজার ৫১২ কোটির কিছু বেশি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে এক হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা।
মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীর আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভাব পড়েছে বিতর্কিত কোম্পানির শেয়ারে। সপ্তাহ শেষে লাগামহীন অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধিতে থাকা ২৬টি বিতর্কিত স্বল্প মূলধনির কোম্পানির অধিকাংশেরই শেয়ারদর সপ্তাহ শেষে কমেছে। ফলে গত সপ্তাহে শেয়ারদর হারানোর শীর্ষ দশটিতে স্থান হয়েছে অধিকাংশ বিতর্কিত কোম্পানির।
ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি ২৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ দর হারিয়ে প্রথম অবস্থানে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে দর বৃদ্ধিতে বিতর্কিত হওয়া বিডি অটোকারস। গত ৫ জুলাইয়ে দিনশেষে ডিএসইতে শেয়ারটির দর ছিল ৪৫৬ টাকার ওপর। সপ্তাহ শেষে গত ১২ জুলাই তা হাতবদল হয়েছে ৩৪০ টাকায়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোম্পানিটি শেয়ারদর হারিয়েছে ১১৬ টাকা। গত ৫ জুলাই সর্বোচ্চ ৪৫৬ টাকার ওপরে হাতবদল হয়েছিল শেয়ারটি।
পুঁজিবাজারে ১৯৮৮ সালে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের এ কোম্পানিটির নতুন কোনো বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেই। তারপরও কোনো কারণ ছাড়াই গত মে মাসের শেষ সময়ে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে শেয়ারদর। গত বছরের জুলাই থেকে গত ২৮ মে পর্যন্ত শেয়ারটি ১০১ থেকে ১০৯ টাকার মধ্যে হাতবদল হয়। এরপর থেকেই শেয়ারটির দর বৃদ্ধি পেতে থাকে অস্বাভাবিক গতিতে।
প্রকৌশল খাতের এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র তিন কোটি ৮৬ লাখ। অন্যদিকে অনুমোদিত মূলধন হচ্ছে ১০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে হিসাববছর শেষে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা করেছে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। আগের বছরে মুনাফা ছিল ১৪ লাখ ও ২০১৫ সালে ছিল ১২ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০১৭ ও ২০১৬ সালে বিনিয়োগকারীদের তিন শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানিটি।
একই অবস্থা চলে প্রকৌশল খাতের আরেক কোম্পানি মুন্নু জুট স্টাফলারের শেয়ারদরে। সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে শেয়ারটির দর কিছুটা কমলেও শেষের দিকে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শেয়ারদর হারানোর তালিকায় আরও বিতর্কিত কোম্পানির নাম যোগ হয়েছে। এর মধ্যে লিবরা ইনফিউশনস ১৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ দর হারিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এরপরেই রয়েছে এএমসিএল (প্রাণ) দর হারিয়েছে ১৯ দশমিক ১০ শতাংশ।
এছাড়া বসুন্ধরা পেপার ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ওয়াটা কেমিক্যালস ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, আজিজ পাইপস ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ দর হারিয়েছে। শীর্ষ ১০ কোম্পানির শেয়ারদর হারানোর মধ্যে বিতর্কিতই সাতটি।
জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শেষ সময়ে মূলত জুন ক্লোজিংয়ে কর সুবিধা নিতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেন মৌসুমি বিনিয়োগকারীরা, যা জুলাই মাসেও চলছে। অন্যদিকে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসায় এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ফলে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর প্রভাবেই মূলত বিতর্কিত কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির প্রবণতা কমতে শুরু করে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে হলে কারণ ছাড়া শেয়ারদর বৃদ্ধির প্রবণতা রুখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিমুখী করতে হবে বিনিয়োগকারীদের। তাহলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারবেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বাজারও বিনিয়োগকারীবান্ধব হবে।