পুঁজিবাজারে নতুন মাইলফলক

গতকালের শেয়ার বিজে ছাপা ‘কৌশলগত বিনিয়োগকারী : চীনা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ডিএসইর চুক্তি সই’ শিরোনামের খবরটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। অন্যান্য সংবাদপত্রেও খবরটি এসেছে গুরুত্বের সঙ্গে। অবশ্য এটি শুধু স্থানীয় গণমাধ্যম নয়, বিশ্ব মিডিয়ায়ও এসেছে সঙ্গত কারণেই। ‘কৌশলগত বিনিয়োগকারী’ হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ছিল বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারত, তুরস্ক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের। সেখানে নাসডাকের মতো সংস্থাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় চীনের সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম। এ লক্ষ্যে ডিএসই কর্তৃক ২৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের চুক্তিও সই হয়েছে এর মধ্যে। সে অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘চীনের সঙ্গে চুক্তি দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার উভয়ের জন্য ভালো। এতে আমরা লাভবান হবো। কারণ চীন অনেক বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।’ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন মন্তব্য করেন, ‘আজ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বৈচিত্র্যপূর্ণ ইতিহাসের আরও একটি বিশেষ দিনÑএক্সচেঞ্জের সফলতার এ নতুন মাইলফলক একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে ইঙ্গিত করছে।’ তাদের কারও বক্তব্যের সঙ্গেই দ্বিমত পোষণের সুযোগ কমÑকনসোর্টিয়ামটির সক্ষমতা ও ট্র্যাক রেকর্ডের কারণেও। আমরা এ উদ্যোগটিকে সর্বান্তকরণে স্বাগত জানাই এবং একই সঙ্গে তা থেকে কাক্সিক্ষত সুফল প্রত্যাশা করি।
খেয়াল করার মতো বিষয়, ডিএসইতে কৌশলগত বিনিয়োগ নিয়ে কম ঘোলা হয়নি জল। মাঝে এমন জল্পনাও শোনা গিয়েছিল, ভারতীয় সংস্থাটি কৌশলে বা প্রভাব খাটিয়ে চুক্তি করতে চাইছে। তার কিছু সাময়িক প্রভাব বাজারে পড়েছিল বলেও অনেকের পর্যবেক্ষণ। তবে জল্পনাকে ভুল প্রমাণ করে সর্বোচ্চ দরদাতার সঙ্গেই বিএসইসি কৌশলগত বিনিয়োগ চুক্তি সম্পাদক করল। এটাকে স্বাভাবিকতার পক্ষে অবস্থান বলেই আমরা মনে করি। একে আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির দৃষ্টান্তও বলবেন অনেকে। কৌশলগত বিনিয়োগ ইস্যুতে বিএসইসি’র দর কষাকষিও প্রশংসনীয়। প্রত্যাশা থাকবে, কেবল এটি নয়; আগামীতে পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে এমনই দৃঢ়তা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দেবেন তারা।
পাশাপাশি তাগিদ থাকবে, শুধু চুক্তি সম্পাদন করে ক্ষান্ত দেওয়া নয়Ñচীনা কনসোর্টিয়ামটি থেকে যথেষ্ট সুফল আহরণেও যেন সমানভাবে দৃষ্টি দেয় বিএসইসি আর ডিএসই। যে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদের বাজারে সম্পৃক্ত হলো, তাদের উভয়েরই অভিজ্ঞতা রয়েছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার সামলানোর। তাদের এমন অভিজ্ঞতাকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের জন্য এখন বরং চ্যালেঞ্জ হলো ওই অভিজ্ঞতা-সক্ষমতার অধিকতর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা। লক্ষণীয়, চীনা কনসোর্টিয়ামটি অর্থনৈতিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে সহায়তা জোগাবে ডিএসইকে। তার সঙ্গে ডিএসইর প্রত্যাশা, এর সহায়তায় নতুন নতুন পণ্য যুক্ত করে স্থানীয় পুঁজিবাজারকে গড়ে তোলা যাবে বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে। এ আশা পূরণ হোক, এমনটাই সংশ্লিষ্ট সবার কামনা। তবে সেজন্য চীনা কনসোর্টিয়ামকে যথাসম্ভব সহায়তা জোগাতে হবে সংশ্লিষ্টদের। লক্ষ করা দরকার, এ দেশে অবকাঠামো খাতে বিদেশি সহায়তা তথা অংশগ্রহণের নজির প্রচুর এবং সেখানে পারস্পরিক সহায়তার ইস্যুটি অবিমিশ্রভাবে সুখকর নয়। সেটা কি কোনো পক্ষের অসহযোগিতা নাকি উভয়ের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির কারণে, তা স্পষ্ট নয়। তবে কারণ যেটিই হোক, ডিএসইতে কৌশলগত বিনিয়োগের বেলায় তেমনটি ঘটবে না সেটাই প্রত্যাশা। অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা ও একটি দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে কৌশলগত বিনিয়োগ এক বস্তু নয়। অবকাঠামোর তুলনায় পুঁজিবাজার অনেক বেশি স্পর্শকাতর ও গতিশীল। চীনা কনসোর্টিয়াম ও বিএসইসি উভয়েই এ ব্যাপারে সজাগ রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস।