পুঁজিবাজারে প্রসারিত হচ্ছে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম


নিয়াজ মাহমুদ: পুঁজিবাজারের বিদ্যমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা বা ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি কার্যক্রম শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। চলতি বছরের শুরুতে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বল্প সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ শিক্ষার কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানী ও বিভাগীয়সহ জেলা শহরগুলোতে। বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ ও পুঁজিবাজারের স্টেকহোল্ডাররাসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এ কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতিনিয়তই সমৃদ্ধ হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা আর বাজারের সঙ্গে যুক্তও হচ্ছেন নতুন বিনিয়োগকারী।

এদিকে দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে সরকারও উদ্যোগী হয়েছে। আগামীতে বিনিয়োগ শিক্ষা তহবিলে স্টেকহোল্ডারদের দেওয়া অনুদান সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এ-সংক্রান্ত একটি এসআরও জারি করতে ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সহকারী সচিব শেখ সিদ্দিকুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠি গত মাসের শেষ দিকে এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়, বিনিয়োগ শিক্ষা প্রসারে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুদানকে আয়কর-সংক্রান্ত অনুমোদিত ব্যয়ের খাত ও শিডিউল বি-তে সিএসআর প্রোগ্রামে অনুদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এসআরও জারির নির্দেশ দেওয়া হলো। এতে অর্থমন্ত্রীর সদয় অনুমোদন রয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা। শীর্ষস্থানীয় মার্চেন্ট ব্যাংক এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুবব এইচ মজুমদার শেয়ার বিজকে বলেন, দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা দেরিতে হলেও বিএসইসি উদ্যোগ নিয়েছে। এটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বিনিয়োগকারীরা শিক্ষিত হলে সব পক্ষই উপকৃত হবেন। আর এ-সংক্রান্ত তহবিলে দেওয়া অনুদানকে সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় দেখানোর সুযোগ দেওয়া ইতিবাচক। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ শিক্ষার পাশাপাশি বাজারের পরিধি বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ নভেম্বর ‘বিনিয়োগ শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ বিধিমালা, ২০১৬’ প্রণয়ন করে। এ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে বিধিমালার ৯ নং বিধিতে বিনিয়োগ শিক্ষা তহবিল নামে একটি তহবিল গঠনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তাই উভয় স্টক এক্সচেঞ্জসহ পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিএসইসি তহবিল সংগ্রহ করে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিএসইসি জানিয়েছে, বিনিয়োগ শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বল্প মেয়াদে চলতি বছর বিদ্যমান বিনিয়োগকারী, পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মরত ব্যক্তি, বিচারক, প্রশিক্ষক, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আইনজীবী, সাংবাদিক ও শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। মধ্য মেয়াদে ২০১৯ সালের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবী মধ্যম আয়ের মানুষকে যুক্ত করা হবে। আর দীর্ঘ মেয়াদে ২০২১ সালের মধ্যে গৃহিণী থেকে শুরু করে শ্রমিক, কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে এ শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

এ বিষয়ে বিএসইসি’র মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান শেয়ার বিজকে জানান, বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রসারিত করতে ইতোমধ্যে বিএসইসি বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে খুলনা ও রাজশাহী শহরে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ কার্যক্রমকে বাস্তব রূপ দিতে কমিশনে ‘ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বিভাগ’ নামে আলাদা একটি বিভাগও চালু করা হয়েছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগ শিক্ষার প্রথম ধাপে ১২টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এগুলো হলো আর্থিক খাত, অর্থ ও পুঁজির ধারণা, ব্যক্তিপর্যায়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব, দৈনন্দিন বাজেট প্রণয়ন, সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাত, নিজস্ব তহবিল ও ঋণের ব্যবহার, সাধারণ এবং চক্রবৃদ্ধি সুদ-সংক্রান্ত ধারণা, বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি, বিনিয়োগ মাধ্যম এবং সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি, নিজস্ব আর্থিক সঙ্গতি অনুযায়ী বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব এড়িয়ে চলার কৌশল, বিনিয়োগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি, দীর্ঘমেয়াদি নিজস্ব আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়নের উপকারিতা ও কৌশল, বিকল্প বিনিয়োগ খাত বিশ্লেষণ ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি।

জানা গেছে, দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য একদল প্রশিক্ষক তৈরি করা হচ্ছে। বিএসইসির অধীনে একটি একাডেমিটি গঠন করা হবে, তার মাধ্যমে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়। আর কাদের প্রশিক্ষক হিসেবে তৈরি করা হবে, তার মানদণ্ড কমিশন নির্ধারণ করবে।

এদিকে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমকে সর্বত্র জড়িয়ে দিতে স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক ও বাজার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে। রাজধানীসহ জেলা শহরে প্রতিষ্ঠানগুলো একক ও যৌথভাবে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চলাচ্ছে।