পুঁজিবাজারে লেনদেন কর প্রতিবেশী দেশের তুলনায় অনেক বেশি

শেখ আবু তালেব: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বিভিন্ন ধরনের ফান্ডের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতি লেনদেনের ওপর নির্দিষ্ট হারে কর আদায় করে থাকে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ। কর সংগ্রহ করে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয় স্টক এক্সচেঞ্জগুলো। বাংলাদেশে এ কর আদায়ের হার প্রতিবেশী দেশ ভারত বা পাকিস্তান এমনকি হংকং চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। করহার কমালে বিনিয়োগকারীরা অন্যখাতে এ অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবে ও পুঁজিবাজারে দৈনিক লেনদেন আরও বেশি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) শেয়ার মূল্য, ডিবেঞ্চার, মিউচুয়াল ফান্ড ও সিকিউরিটিজ লেনদেনে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ কর আদায় করে। সরকারের পক্ষে ডিএসই ও সিএসই এ কর সংগ্রহ করে। নির্দিষ্ট সময়ে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয় এক্সচেঞ্জ দুটি।

প্রতিবেশী দেশগুলোর স্টক এক্সচেঞ্জের দেওয়া তথ্যমতে, ভারতের প্রধান পুঁজিবাজার বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (বিএসই) ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জসহ (এনএসই)  অন্যান্য এক্সচেঞ্জগুলো লেনদেনে শূন্য দশমিক শূন্য এক তিন শতাংশ কর নেয়। পাকিস্তানে এ হার শূন্য দশমিক শূন্য দুই শতাংশ ও হংকংয়ে শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য দুই সাত শতাংশ। অপরদিকে বাংলাদেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ সরকারের নির্দেশ মতো লেনদেনে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ কর আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ হার কমিয়ে আনলে পুঁজিবাজারে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আরও সক্রিয় হবেন। বাজারে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন নতুন বিনিয়োগকারীরা। সাধারণ বিনিয়োগকারী, ব্রোকারেজ হাউজ ও প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কিছুটা লাভবান হবেন ও অর্জিত মুনাফা অন্য খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। এতে সরকার করহার কমালে লেনদেনের (ট্রেড) পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। তখন ঘাটতি কর ট্রেড বৃদ্ধির মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে সরকারের আয়ে ঘাটতি হবে না। ডিএসই কর্তৃপক্ষও চায় সরকার ট্রেড বাড়িয়ে আয় করুক।

বিশ্বের স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সংগঠন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জেসের দেওয়া তথ্য মতে, সার্ক দেশগুলোর মধ্যে কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বাজার মূলধন দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২২ দশমিক ৬৯ শতাংশ, পাকিস্তান স্টকের দেশটির জিডিপির ২৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ভারতের বোম্বে স্টকের বাজার মূলধন দেশটির জিডিপির ৯৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এছাড়া ফিলিপাইনের ৯০ দশমিক ৪১ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ১৭৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ ও থাইল্যান্ড এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন জিডিপির ১২৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

অথচ বাংলাদেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টকের বাজার মূলধন জিডিপির ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজার মূলধন বৃদ্ধি করতে হলে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য করসহ বেশকিছু ছাড় দেওয়া প্রয়োজন।

লেনদেন কর বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কর্তারা। তারাও চান এই করহার কমিয়ে আনতে। আগামী অর্থবছর (২০১৮-২০১৯) থেকে এ করহার কমিয়ে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক শূন্য ১৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে। আগামী অর্থবছরের বাজেট তৈরির আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাবসায়ীদের নিয়ে প্রাক-বাজেট সংলাপ করছে এনবিআর। প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআরের কাছে দেওয়া নতুন প্রস্তাবগুলোর মাঝে ডিএসইর এ প্রস্তাবও রয়েছে।

অপর এক ব্যাখ্যায় ডিএসই জানিয়েছে, বর্তমানে ডিএসই কিছুটা কর সুবিধা পাচ্ছে। আরও তিন বছর এ সুবিধা থাকবে। কর সুবিধা শেষ হলে ডিএসইর আয় বাড়াতে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন লেনদেনে সার্ভিস চার্জ বৃদ্ধি করতে হবে। যা এক পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের ঘাড়ে গিয়েই পরবে। এতে পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ট্রেডের পরিমাণ কমে যাবে।

ডিএসইর মতে ফাইন্যান্স অ্যাক্ট ২০০৫ অনুযায়ী বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে লেনদেনের ওপর করহার অনেক বেশি। যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায়ও বেশি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পুঁজিবাজার তৈরি করতে হলে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিল রেখেই করহার চালু করা উচিত। তাহলে আমাদের পুঁজিবাজারও গতিশীল হবে।