পুঁজিবাজার উন্নয়নে যা কিছু প্রয়োজন

‘বাংলাদেশে এখনও শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে ওঠেনি’ মর্মে যে কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। তবে ‘শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে’ মন্তব্য নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ আছে। রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে রোববার বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আয়োজিত ‘বিনিয়োগ শিক্ষার গুরুত্ব ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান কমিশন আট বছর দায়িত্ব পালন করছে। কমিশন অনেক পরিশ্রম করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সংস্কার কার্যক্রম চালিয়েছে বলে তিনি খুশি বলেও জানান।
বর্তমান কমিশনের ওপর অর্থমন্ত্রী খুশি। কেন খুশি, তা অবশ্য স্পষ্ট করেননি। নিজেদের নিয়োগ করা কমিশনের ওপর খুশি হতেই পারেন। তা না হলে বোধকরি ব্যর্থতার অভিযোগ উঠবে। কিন্তু পুঁজিবাজারের প্রাণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং তাদের বাজারে ধরে রাখতে কমিশনের কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে প্রায়ই শোনা যায়।
আমরা জানি, বাজার পরিস্থিতি উন্নয়নে এক্সপোজার সমস্যার সমাধান, ডিমান্ড সাইট শক্তিশালীকরণ, মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্তি, ব্রোকারেজ হাউজের শাখা বৃদ্ধি, শর্ট সেল চালুকরণসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। মার্কেট পড়ে গেলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা নড়েচড়ে বসে। এরপর কাজে ধারাবাহিকতা থাকে না; থাকে না নজরদারি। ফলে পুুঁজিবাজার পরিস্থিতি সাময়িক মোকাবিলা করা গেলেও সমস্যা থেকেই যায়। এ বাজারে পতনের পেছনে তারল্য সংকট রয়েছে। আর এ সংকট সৃষ্টি হয় সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অসতর্কতায়। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি শেয়ারবাজারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগসীমা দিয়ে সংকট সৃষ্টি করেছে। এছাড়া অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজার উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংককে কিছু সুপারিশ করলেও ব্যাংকটি সেগুলো পরিপালন করছে না।
বর্তমানে লক্ষাধিক লিমিটেড কোম্পানি কোম্পানি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত। এর মধ্যে কমপক্ষে কয়েক হাজার কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা আছে। কিন্তু আমাদের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা নগণ্য। বাজার চাঙা করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি, মোবাইল ফোন অপারেটর এবং ইউনিলিভার ও নেসলের মতো ব্যাপক মুনাফা অর্জনকারী বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে সুস্পষ্ট তাগিদ ও নির্দেশনা দিতে হবে। আর বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে যথাযথ আইনি সংস্কার প্রয়োজন।
তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির মধ্যে করপোরেট করের ব্যবধান ১০ শতাংশ রয়েছে। এ ব্যবধান বাড়ানো হলে এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ আয়ে দ্বৈত কর রহিত করা হলে ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে উৎসাহিত হবে বলে ধারণা।
শেয়ারবাজার অবকাঠামোর টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে মানসম্মত এবং লাভজনক করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে বাজারে তালিকাভুক্ত করতে আইনি বাধ্যবাধকতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।
শেয়ারবাজার শক্তিশালীকরণে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ-আইসিবি’র ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাপিটাল মার্কেট স্পেশাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবির ভূমিকা যাতে আগামী দিনগুলোয় আরও জোরদার করা যায়, তা নিশ্চিত করা চাই। এ লক্ষ্যে আইসিবিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃক আইসিবিকে দেওয়া ফান্ড বা ঋণ সিঙ্গেল এক্সপোজার লিমিটে শিথিল করতে হবে। বাজারকে কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে তোলার চেষ্টা না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। গুঞ্জন-গুজবে প্রভাবিত না হয়ে বিনিয়োগকারীদেরও মেধা খাটিয়ে বিনিয়োগ করা উচিত। আর বাজার নিয়ে উচ্চাশা না দেখিয়ে দায়িত্বশীলদের উচিত একে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া এবং বাজারবিষয়ক সব তথ্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকা ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া।