পুঁজি হারিয়ে আবারও রাস্তায় বিনিয়োগকারীরা

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: দেশের পুঁজিবাজারে নীরব দরপতন চলছে। দিন যতই যাচ্ছে ততই পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হচ্ছে। প্রতিদিনই উধাও হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি। হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া একযোগে কমছে তালিকাভুক্ত সব খাতের শেয়ারের দর। এই পরিস্থিতিতে ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা, বাড়ছে ক্ষোভ। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গতকাল অস্বাভাবিক দরপতন হলে কোনো উপায়ান্তর না দেখে রাস্তায় নেমে আসেন তারা।

এর আগে ২০১০ সালে তারা বিক্ষোভ করেছিলেন। এর প্রায় আট বছর পর আবার রাস্তায় নেমেছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পুঁজিবাজারে সিঁদুরে মেঘের ঘনঘটা দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাদের অবস্থা করুণ হবে বলে তারা অভিমত প্রকাশ করেন।

সাম্প্রতিক দরপতনের জের ধরে গতকালও সকাল থেকে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর কমতে থাকে। পরে অব্যাহত দরপতনের প্রতিবাদে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে মানববন্ধন করেন বিনিয়োগকারীরা। তারা বলেন, পুঁজিবাজারের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার কারা হবে কিংবা রাজনৈতিক পরিবেশ কী হবে, সেটি তাদের দেখার বিষয় নয়। বিনিয়োগকারীরা চায় মার্কেট ভালো থাকুক। পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর এক্সপোজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক লুকোচুরি খেলছে। চাইলে তারা এক্সপোজারের সংজ্ঞা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে। এ সময় তারা বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ অন্য কমিশনারদের পদত্যাগ দাবি করেন।

মানববন্ধন শেষে বাজারে টানা পতনের বিষয়ে মতামত জানাতে ডিএসই চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিনিয়োগকারীরা। সাক্ষাতে ডিএসই চেয়ারম্যান যেকোনো মূল্যে বাজারকে ভালো করার আশ্বাস দেন এবং অচিরেই তা সম্পন্ন হবে বলেও জানান তিনি।

বর্তমান পুঁজিবাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত বছরের শেষ সময়ে পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে, চলতি বছরের শুরুতে যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, নতুন বছরের ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ৫৩৯ পয়েন্ট। গত বছরের শেষ দিনে সূচকের অবস্থান ছিল ছয় হাজার ২৪৪ পয়েন্টে, গতকাল যা স্থির হয়েছে পাঁচ হাজার ৭০৫ পয়েন্টে।

নতুন বছরে (গতকাল পর্যন্ত) মোট লেনদেন হয়েছে ৫০ কার্যদিবস। আর এ সময়ের মধ্যে সূচকের পতন হয় ৫৩৯ পয়েন্ট। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে সূচকের পতন হয়েছে প্রায় ১১ পয়েন্ট করে। বিষয়টিকে ভয়াবহ পরিস্থিতি বলেছেন বাজারসংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাদের অভিমত, চলমান পরিস্থিতি বিরাজ করলে তাদের অবস্থা ২০১০ সালের চেয়ে কঠিন হবে।

এ প্রসঙ্গে আশরাফুল আলম নামে এক বিনিয়োগকারী বলেন, বহুদিন থেকে বাজারে নীরব দরপতন চলছে। অথচ বিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখছে না। ফলে বাজারও তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসছে না।

সাম্প্রতিককালের বাজারচিত্র লক্ষ করলে দেখা যায়, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল ছিল। ফলে তখন বাজারে আসেন নানা শ্রেণির মানুষ। কিন্তু বছরের শেষদিকে নানা ইস্যুতে বাজার পতন শুরু হয়। ফলে বেকায়দায় পড়েন বিনিয়োগকারীরা।

এ প্রসঙ্গে রশিদ ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ রশিদ লালী বলেন, বর্তমানে মুদ্রাবাজারে তারল্য সংকট চলছে, যার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। সে কারণে মুদ্রাবাজার থেকে এই সংকট দূর করা দরকার। তিনি বলেন, বাজারের এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের ধৈর্যধারণ করা ছাড়া কোনো গতি নেই।

একই বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে নজরদারির অভাব রয়েছে। যাদের বাজারকে সাপোর্ট দেওয়ার কথা তারা বর্তমানে চুপ রয়েছে। ফলে বাজারচিত্র বদলাচ্ছে না। তিনি বলেন, এ কথা ঠিক যে বর্তমানে বাজারে বেশিরভাগ শেয়ার সস্তা, কিন্তু এখানে নতুন অর্থ না এলে এসব শেয়ার আরও সস্তা হয়ে যাবে।