পুনর্জীবিত মূলধন

দুঃসাহসী সওদাগর: পর্ব-৩৯

শামসুন নাহার: হার্শম্যান ও গুরুমূর্তি বের করলেন, গোপনে অর্থ পরিশোধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে রিলায়ান্সেরই কোনো ব্যবসায়িক সঙ্গী। এটা হতে পারে তার চোরাকারবারির সাপ্লায়ার ডু পন্ট বা আমেরিকার কেমিক্যাল কোম্পানি কেমটেক্স ফাইবার ইনকরপোরেশন। হার্শম্যান বললেন, এ ব্যাপারে তদন্ত করতে হলে এসব কোম্পানির কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দাবি করতে হবে। আর এজন্য ভারত সরকারের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে কোম্পানির স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোপনীয়তার অজুহাত দিয়ে তথ্য দিতে অসম্মতি জানাবে তারা।

গুরুমূর্তির অনুরোধে ভারতে এলেন হার্শম্যান। দিল্লির ওবেরয় হোটেলে উঠলেন। গুরুমূর্তির মাধ্যমে ভুরে লালের সঙ্গেও দেখা করলেন তিনি। তাদের মধ্যে একটি চুক্তি হলো। হার্শম্যান রিলায়ান্সের কেস নিয়ে কাজ করবেন, সহায়তা করবেন ভারত সরকারের ইডিকে। বিনিময়ে পাবেন পুনরুদ্ধার করা অর্থের ২০ শতাংশ এবং ইডির তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে মানসম্মত সম্মানী। এ কেস থেকে ঠিক কী পবিমাণ অর্থ উদ্ধার করা যাবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারপরেও এটি হার্শম্যানের জন্য ভালো ডিল। ব্যাপারটা যখন রিলায়ান্সের, অর্থের পরিমাণ বিরাট কিছুই হবে।

এতদিন আলাদাভাবে তদন্ত করছিল বিভিন্ন পক্ষ। এবার প্রেসের সঙ্গে বিদেশি ও সরকারি গোয়েন্দা মিলে মাঠে নেমেছে। প্রথম ধাপে তাদের টার্গেট ছিল মূলত তিনটি। চোরাকারবারি করে আনা প্লান্টের জন্য ডু পন্ট ও কেমটেক্স এবং প্রবাসী ভারতীয়দের বিনিয়োগে অর্থায়নের জন্য ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল (বিসিসিআই)। ডিসেম্বরে তাদের টিমে আরও যুক্ত হলেন ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিসের প্রধান জোসেফ ডি ব্রুনো। ব্রুনোকে ভুরে লাল ভারতের প্রচলিত ‘হাওয়ালা’ পদ্ধতিতে যুক্তরাজ্যে রুপির বিনিময়ে ডলার পাঠিয়েছে এমন অপারেটরদের মধ্যে অনুসন্ধান চালাতে বললেন। ব্রুনো জানালেন, যুক্তরাষ্ট্রে হাওয়ালা পদ্ধতিতে ১০ হাজার মার্কিন ডলারের চেয়ে বেশি পাঠানো বেআইনি।

এরপর হার্শম্যানের প্রতিষ্ঠান ফেয়ারফ্যাক্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট গর্ডন ম্যাকে ও আমেরিকার ডেলাওয়্যারের আইনজীবী জে ই লেগুরিকে সঙ্গে নিয়ে উইলমিংটনে ডু পন্টের হেডকোয়ার্টারে যান ভুরে লাল। সেখানে ডু পন্টের একজন পরিচালক ই ডি ওয়েলারকে একটি কাগজ লেখা ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেন ভুরে লাল। এতে রিলায়ান্সের কাছে ডে প্লান্ট ও প্রযুক্তি বিক্রি করা হয়েছে তা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইল অব ম্যানের ২৫টি কোম্পানির তালিকা দিয়ে তাদের কারও সঙ্গে কোনো লেনদেন হয়েছে কি না তাও জানতে চেয়েছেন ভুরে লাল।

এক সপ্তাহ পরে অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর, ডু পন্ট প্রশ্নমালার উত্তর পাঠায়। তারা নিশ্চয়তা দিয়ে জানিয়েছে, রিলায়ান্সের সঙ্গে লেনদেনে কোথাও কোনো অসঙ্গতি ছিল না। ভারত সরকারের অনুমোদন অনুযায়ীই তারা মালামাল পাঠিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা ডু পন্টের অন্য কোনো প্লান্ট থেকে কোনো প্রকার সেকেন্ড হ্যান্ড উপকরণ পাঠানো হয়নি। কেমটেক্সের মাধ্যমেও কোনো লেনদেন হয়নি। তালিকায় উল্লিখিত কোম্পানির ব্যাপারেও ডু পন্ট জড়িত নয়। অর্থাৎ ভুরে লালের টিম একটা তথ্যও পায়নি ডু পন্টের কাছ থেকে। এরপর কেমটেক্সে খোঁজ নিয়ে দেখলেন, যাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার ক্রিসমাস উপলক্ষে তারা সবাই ছুটিতে রয়েছেন। দিল্লি ফিরে এলেন ভুরে লাল। টেলেক্সের মাধ্যমে যোগাযোগ করলেন ডু পন্ট ও কেমটেক্সের সঙ্গে।

ডু পন্ট রিলায়ান্সের সঙ্গে লেনদেনে কেমটেক্সের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করার পরও থামেননি ভুরে লাল। পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থিত ডু পন্টের হ্যাম উয়েনটপ প্লান্ট থেকে কেমটেক্সের ইকুইপমেন্ট রিলায়ান্সের উদ্দেশ্যে পাঠানোর অভিযোগ করে ছয় পৃষ্ঠার একটি প্রশ্নমালা পাঠান মি. লাল। তিনি এ লেনদেনের প্রতিটি কাগজপত্র ও সার্টিফিকেটের কপি এবং প্রতিটি ইকুইপমেন্টের তালিকা পাঠাতে বলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এটা কীভাবে সম্ভব হলো যে, কেমটেক্সের কাছ থেকে বার্ষিক ১০ হাজার টন পলিয়েস্টার ফিলামেন্ট সুতা উৎপাদনে সক্ষম এমন তিনটি স্পিনিং ইউনিট আমদানি করে বার্ষিক ১৮ হাজার টন সুতা উৎপাদন করছে রিলায়ান্স। অথচ পরে আরও নয়টি স্পিনিং ইউনিট আমদানি করে উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১৫ হাজার টন? আসলেই কি স্পিনিং ইউনিট এনেছে নাকি একটির লাইসেন্স দিয়ে ভিন্ন উপকরণ আমদানি করেছে রিলায়ান্স?

ভুরে লাল যখন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন, তখন সরকারি ইঞ্জিনিয়াররা নিশ্চিত করেন যে, রিলায়ান্সের পাতালগঙ্গা প্লান্টে লাইসেন্সবিহীন যন্ত্রপাতি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রিলায়ান্স বলেছে, তারা চারটি স্পিনিং ইউনিটকে ভাগ করে আটটি ইউনিটে রূপান্তর করেছে। এ বক্তব্য শিল্প মন্ত্রণালয় মেনে নিলেও অর্থ মন্ত্রণালয় মানেনি। তারা বিস্তর অনুসন্ধান শুরু করল। এরই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৮৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কাস্টমস ডিরেক্টরেট থেকে শোকজ করা হয় রিলায়ান্সকে। অভিযোগ অবৈধভাবে প্লান্ট আমদানি, ১১৪ কোটি রুপির অবলিখন (আন্ডার ইনভয়েসিং) এবং ১২০ কোটি রুপি শুল্ক ফাঁকি।

ওদিকে ডু পন্ট ও কেমটেক্সকে প্রশ্নের জবাব দিতে তো আর বাধ্য করতে পারে না ভারত সরকারের কর্মকর্তা ভুরে লাল। এজন্য অন্তত এসব লেনদেনে আমেরিকার কোনো আইন ভঙ্গ হয়েছেÑএমন কোনো খুঁত বের করতে হবে ফায়ারফ্যাক্সের মাধ্যমে। ভুরে লাল বড়জোর ভারতে এ কোম্পানিদ্বয়কে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করতে পারে।

তাহলেও পরিস্থিতি এমন ছিল যে, বৈদেশিক বাণিজ্য সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়েছিল রিলায়ান্সকে। কারণ তখন ঘরের ঝামেলাই বড় বোঝা হয়ে উঠল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একের পর এক অভিযোগ ও গাদাগাদা শোকজ নিয়ে গভীর বিপদে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আম্বানি। এতদিন বেয়ার কার্টেলরা ভয়ে কাছে ঘেঁষেনি। রিলায়ান্সের শেয়ার নিয়ে স্পেকিউলেট করার চিন্তাও করেনি কেউ। এখন বাগে পেয়ে তারাও চড়ে বসেছে। মানুভাই মানেকলাল নামে এক ব্রোকারের নেতৃত্বে বেয়াররা এক বছরেই বেশ কয়েকবার রিলায়ান্সের শেয়ারমূল্য ৪০০ রুপি থেকে ২০০ রুপিতে নামিয়ে দিল।

ক্রস মেইডেন পার্কের মাঠে যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বক্তব্য দিয়েছিলেন ধীরুভাই, তাতে সব প্রোপাগান্ডার মধ্যেও আস্থা খুঁজে পেয়েছিল শেয়ারহোল্ডাররা। কিন্তু ১৯৭৭ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সে বছরই প্রথমবারের মতো মুনাফা কমেছে রিলায়ান্সের। ই ও এফ সিরিজের ডিবেঞ্চারের কনভারশন নিষিদ্ধ করায় বেড়েছে সুদহার। আবার পলিয়েস্টার আমদানির ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক বাদ দেওয়াতেও কমেছে মুনাফা। সুতরাং এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানিতে  নগদ অর্থের আগমন দরকার। এ উদ্দেশ্যে অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রিলায়ান্স ক্যাপিটাল অ্যান্ড ফাইন্যান্স ট্রাস্ট কোম্পানির মাধ্যমে নতুন শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন চান আম্বানি। কিন্তু ক্যাপিটাল ইস্যুর কন্ট্রোলার এ আবেদন খারিজ করে দেন। কারণ ধীরুভাই ১০ রুপির শেয়ারের ওপর ২৫ রুপি প্রিমিয়ামসহ অনুমোদনের প্রস্তাব দিয়েছেন। রিলায়ান্স ক্যাপিটাল নিবন্ধন করেছে ১৯৮৬ সালের মার্চে। এর মধ্যে এ কোম্পানির মুনাফা তো দূরের কথা, কোনো লেনদেনের রেকর্ড পর্যন্ত নেই। কেবল আম্বানির সুনামের ওপর এমন প্রস্তাব মেনে নেওয়া কর্তৃপক্ষের কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি। যা-ই হোক, ধীরুভাইও এর জবাব দিলেন রিলায়ান্সের জি সিরিজ কনভার্টিবল ডিবেঞ্চার ইস্যু করে। ২০০ রুপি মূল্যের দুই কোটি ডিবেঞ্চার ইস্যু করে ৪০০ কোটি রুপি মূলধন সংগ্রহ করল রিলায়ান্স। এটি ছিল তখন পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে বড় ক্যাপিটাল ইস্যু। ফলে মাত্র ছয় মানের মধ্যেই আরেক দফা দেনাতে বৃহৎ অঙ্কের মূলধনে রূপান্তর করলেন ধীরুভাই। কিন্তু এখানেও বাগড়া বাধালেন ক্যাপিটাল ইস্যুর কন্ট্রোলার। তার দাবি, প্রতিটি ডিবেঞ্চার দুটি করে শেয়ারে রূপান্তর করতে হবে। এ প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু এ সমস্যাকেও ইতিবাচক মার্কেটিংয়ে কাজে লাগাল রিলায়ান্স। গণমাধ্যমে প্রচার করা হলো, মাত্র ১৪৫ রুপির বিনিময়ে রিলায়ান্স আপনাকে যা দিতে পারে তা আর কেউ পারবে না। আপনারা জানেন, মাত্র ১০ রুপি মূল্যে রিলায়ান্স শেয়ারের বাজার মূল্য এখন ২২৫ রুপি। তাই এর চেয়ে কম মূল্যে কারও পক্ষে রিলায়ান্সের শেয়ার বিক্রি করা সম্ভব নয়। এটা পারে কেবল রিলায়ান্স। রিলায়ান্স আপনাদের জন্য এনেছে আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ। এবার একটি নয়, কনভার্টিবল ডিবেঞ্চার ইস্যুর মাধ্যমে পাচ্ছেন দুটি রিলায়ান্স শেয়ার মাত্র ১৪৫ রুপিতে!

এভাবেই নতুন ইস্যুর তুমুল প্রচারণা চালায় রিলায়ান্স। মূলধনকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা তার সফলই হয়েছে বলতে হবে। যদিও দেশের বিভিন্ন অংশে রিলায়ান্সের কয়েকজন পুরোনো শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরিস্থিতি প্রতিকূল হওয়ায় ছোট সমস্যাও বড় আঘাত পরিণত হয়। একপর্যায়ে ধীরুভাই এক প্রেস কনফারেন্সে স্বীকার করেন, সাম্প্রতিককালে প্রেসের তদন্ত ও সরকারি অভিযানের কারণে রিলায়ান্সের ব্যবসায়িক কার্যাবলি অনেকটাই চাপের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ আশ্বাসও দেন যে, এর প্রভাব শেয়ারহোল্ডারদের ওপর পড়বে না।