সম্পাদকীয়

পুরান ঢাকার আধুনিকায়ন হোক ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখে

মুঘলদের গড়ে তোলা সুপরিকল্পিত, ছিমছাম পুরান ঢাকা আজ নানাবিধ নাগরিক সংকটে জর্জরিত। দুবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখন যেন আতঙ্কপুরী। আধুনিক ঢাকার সঙ্গে তাল মেলাতে এখন একেবারেই অপারগ। তাই কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, নয়াবাজার, সূত্রাপুর, গুলিস্তান, খিলগাঁও, মুগদা ও বাসাবোসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক ৮৩৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে। জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা বাড়ানো, নগরসেবা উন্নয়ন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নকল্পের এ প্রকল্প দেশবাসীর আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ শিরোনামে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ইআরডি চুক্তি করেছে।
পুরান ঢাকার মতো একটি সিটি নেইবারহুড এখনও তার বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক সমৃদ্ধি নিয়ে টিকে আছে। লস এঞ্জেলসের প্রধান মেট্রো এলাকার হৃদয়ভাগে জেগে থাকা সিটি নেইবারহুডের নতুনের সঙ্গে পুরোনোর মিশেলে যৌথ মালিকানার বড় অ্যাপার্টমেন্ট ও উঁচু দালান গড়ে উঠেছে। এসব উন্নয়নে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বিনষ্ট হওয়ার নজিরও রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে। নগরবাসীর ব্যবহারে অপর্যাপ্ত জায়গা, শব্দদূষণ, ঝুঁকিপূর্ণ গতিতে গাড়ি চালানো সিটি নেইবারহুডের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এ প্রকল্পে সাধারণের ব্যবহারের উম্মুক্ত জায়গা বাড়ানো ও যান চলাচল সহজকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা নগরীর জন্য শুভকর হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আশঙ্কাজনক। লালবাগের কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, ঢাকেশ্বরী মন্দির, তারা মসজিদ, আর্মেনীয় গির্জা, ইমামবাড়ার মতো অতিচেনা দর্শনীয় স্থান সংরক্ষণেই কেবল ঐতিহ্য সংরক্ষণ হয় না। প্রত্নঐতিহ্যে রাজকীয় জীবন ও সাধারণ সামাজিক জীবন সমগুরুত্বের। সদরঘাট, সোয়ারীঘাট বা চকবাজার, শাঁখারীবাজারের মতো রাস্তাঘাট কিংবা পুরাতন বাজারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ঐতিহ্য। বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক আইনানুযায়ী প্রত্ন-ঐতিহ্যের বয়স ১০০ থেকে নামিয়ে ৫০ বছর করা হয়েছে। অথচ এসব ঐতিহ্য কয়েকশ বছরের প্রাচীন। ২০০৯ সালের ঘোষণা অনুযায়ী ৯৩ ভবন ও চারটি এলাকা শনাক্ত করা হলেও ২০১৬ সালের হেরিটেজ কমিটি আরও তিন হাজার ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকা দেয়। কিন্তু সেই কমিটি বাতিল করা হয়েছে। যা-ই হোক, রাজউকের ঘোষণানুসারে এসবের কোনো পরিবর্তন বৈধ নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য আইন, ২০০৪ অনুসারে কোনো স্থাবর প্রত্ন সম্পদের মালিক যে-ই হোক, তার কোনো ক্ষতিসাধনে জেল-জরিমানা সাব্যস্ত হয়।
উল্লেখ্য, ডিআইটি ও রাজউকের মানচিত্রে ছোট কাটরা, বড় কাটরা ও ভাওয়াল জমিদার বাড়ি মুছে ফেলা হয়েছে; সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। নিয়মানুযায়ী এ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে ঐতিহ্যগুলোর আশেপাশে ২৫০ মিটারের বাফার জোন রাখতে হবে এবং বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা দখলমুক্ত করা হবে বলে আশা রাখি।

 

সর্বশেষ..