মত-বিশ্লেষণ

পুষ্টিচাহিদা পূরণ ও পরিবেশ রক্ষায় নারী

শান্তনু শেখর রায়: শহরে আসার পর থেকেই পারভীনের মনটা বিষন্ন হয়ে থাকে। গ্রামে সবুজ প্রকৃতির মধ্যে বড় হয়েছে সে। বাবার সামান্য জমি ছিল। সে জমিতে যে ফসল হতো তা দিয়ে বাবা, মা ও ভাইসহ চারজনের সংসার কোনোভাবে চলে যেত। সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও প্রকৃতির সৌন্দর্যের কোনো অভাব ছিল না। হানিফ শেখের দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে পারভীন বড়। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণের প্রতি পারভীনের খুব ঝোঁক। বাড়ির আঙিনায় সে লাগিয়েছিল বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলদ গাছ।
পারভীনদের বাড়ি বরিশাল জেলায়। নদীভাঙনে ভিটেমাটি বিলীন হয়ে যাওয়ার পর তারা ঢাকায় চলে আসে। আশ্রয় নেয় বস্তিতে। ইট-কাঠ-পাথরের শহরে সবুজ গাছপালার বড়ই অভাব। গ্রামে ঘরের পাশের ছোট একফালি জমিতে পারভীন তার মায়ের সঙ্গে লালশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, বেগুন, মরিচ ও লেবুর চাষ করত। ঘরের চালে হতো লাউ আর কুমড়ো। বস্তিতে সে সুযোগ নেই। একদিন পাশের এক আপার ঘরের সামনে পুঁইশাকের গাছ দেখে অবাক হয় পরভীন। সে দেখে ঘরের সামনে টবের ভেতর নানারকম গাছগাছালি। আপার কাছ থেকেই শহরে সবজি চাষের এই পদ্ধতি শিখে
নেয় পারভীন। বস্তির ঘরের পাশেই সে মাটিভর্তি ব্যাগের ভেতর লাগিয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। ঘরের কাছেই এক টুকরো সবুজ বাগান গড়ে তুলেছে পারভীন।
প্রকৃতির সঙ্গে নারীর সম্পর্ক অতি নিবিড়। মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় কৃষির সূত্রপাত নারীর হাতেই। পরবর্তীকালে বাণিজ্যিক কৃষি বা বৃহৎ চাষবাসের মূল পরিচালনা চলে যায় পুরুষের হাতে। সেখানেও কিষানিরা শ্রম দিয়েছে, কিন্তু মূল কর্তৃত্ব তাদের ছিল না। তবে কৃষির সূচনালগ্ন থেকে এখনও নারী তার ঘরের আঙিনায়, ভিটাবাড়িসংলগ্ন ক্ষেতে লাগায় বিভিন্ন শাক, বেগুন, টমেটো, মরিচ, লেবু, ঝিঙা, পটোল ও ঢেঁড়সের মতো সবজি। ঘরের চালে আর মাচায় লাউ, কুমড়ো, শসা, পুঁইশাক, করলা দেখা যায় নারীর কল্যাণেই। এ ছোট উদ্যোগগুলো পরিবারে কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দ্য আনে, পুষ্টির চাহিদা মেটায়। গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারে অন্তত শাকসবজি কিনে খেতে হয় না। আবহমানকাল থেকে কৃষিকাজের মধ্যে বীজ সংরক্ষণ, ধানমাড়াইসহ অনেক কাজেই রয়েছে নারীর একচেটিয়া প্রাধান্য। কৃষক বলতে যদিও সাধারণভাবে একজন পুরুষকেই বুঝি, কিন্তু কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ের কাজের মধ্যে বেশিরভাগ কাজই সম্পন্ন হয় নারীর হাতে।
কৃষি ও সামাজিক বনায়নে নারীর গুরুত্ব অপরিসীম। পেশা পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে পুরুষের অংশগ্রহণ কমছে, অন্যদিকে কিষানির সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে ছাদকৃষি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ছাদকৃষির ফলে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবারে পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ছাদকৃষির পরিচর্যার কাজটি মূলত নারী ও পরিবারের ছোট শিশুরাই করে থাকে।
আমাদের দেশে যেখানে শাকসবজি চাষের মতো জমি নেই, আবার জলাবদ্ধতা, বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হয়, সেক্ষেত্রে ভাসমান মাচায় সবজি চাষ হচ্ছে। শহরে ঘরের বারান্দা, ছাদ, উঠান, টব বা বস্তায় সবজি চাষ করে নারীরা পরিবারে পুষ্টির জোগান দিতে পারেন। বস্তিবাসী নারীর জন্য এটি বেশ উপযোগী পদ্ধতি। যারা ভাড়াবাড়িতে থাকেন, তারা এ ধরনের সবজি চাষ করে বাড়ি বদলানোর সময় অনায়াসে বস্তা বা টবগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন।
ইট-কাঠের শহর থেকে দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ; কিন্তু মানুষ তার শিকড়কে সহজে ভুলতে পারে না। সবুজে ভরা গ্রামবাংলায় বেড়ে ওঠা মানুষ সবুজকে ধরে রাখতে চায় তার আবাসস্থলে। শৌখিন মানুষ তাদের ঘরবাড়িতে সবুজকে ধরে রাখার জন্য নিজস্ব ভাবনা আর প্রচেষ্টায় বাড়ির ছাদে তৈরি করছে ছাদবাগান। সময়ের সঙ্গে এ বাগান এখন আর শৌখিনতায় আটকে নেই। প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব থেকে বাঁচতে অনেকেই ছাদবাগান করছেন। তাছাড়া নিরাপদ সবজি দিয়ে পারিবারিক পুষ্টিচাহিদা পূরণ, পারিবারিক বিনোদন ও অবসর কাটানোর এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে এ ছাদবাগানগুলো। বাংলাদেশের শহুরে কৃষিব্যবস্থার শৌখিন পদযাত্রা সময়ের বিবর্তনে সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করেছে।
ছাদে বাগান করা কোনো নতুন ধারণা নয়। প্রাচীন সভ্যতায়ও ছাদে বাগান করার প্রচলন ছিল। বিশ্বব্যাপী নগরায়ণ বাড়ছে। শহুরে কৃষি নামে এক নতুন শব্দ আমাদের শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হচ্ছে। ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে পারিবারিক পুষ্টিচাহিদা পূরণে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা আর নগরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে অনেক দেশেই বাড়ির ছাদ, বারান্দা, গাড়ি রাখার স্থান, ফুটপাত, পার্ক, সরকারি খাসভূমি প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে উদ্যান ফসল ও বাহারি ফুলের গাছের সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে সবুজ নগরায়ণ। আমাদের দেশেও আস্তে আস্তে ছাদবাগানের মাধ্যমে ব্যক্তিপর্যায়ে শহরে সবুজায়ন শুরু হয়েছে। সরকার বৃক্ষরোপণে মানুষকে বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ করছে। কয়েক বছর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ছাদে বাগান করলে হোল্ডিং ট্যাক্স কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। সবুজায়নের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত ছিল এক ধরনের অনুপ্রেরণা।
একটি দেশে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের দেশে রয়েছে মাত্র ১১ দশমিক দুই ভাগ। এ প্রেক্ষাপটে ছাদবাগান একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। আমাদের শহরগুলোতে মাটির অস্তিত্ব দিন দিন কমছে। ইট-কাঠের ভবনের পরিবর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো ও কাচে মোড়ানো বহুতল ভবন। বাণিজ্যিক ভবনের টেকসই স্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ধাতব পাত, ফাইবার ও গ্লাস। সূর্য থেকে তাপ ও আলো এ ধাতব কাচের কাঠামোর একটিতে পড়ে অপরটিতে প্রতিফলিত হয়। বারবার প্রতিফলনের ফলে সে নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় বেড়ে যায়। ফলে আস্তে আস্তে শহরজুড়েই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। ছাদে বা ভবনের কাঠামোতে বাগান করা হলে বাগানের গাছের পৃষ্ঠদেশ এ তাপ শুষে নেয় এবং গাছের দেহ থেকে
যে পানি জলীয় বাষ্প আকারে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায়, তা সে নির্দিষ্ট স্থানের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে আনতে পারে। ছাদবাগান ও প্রচুর গাছপালা শহরের উচ্চ তাপমাত্রাকে কমিয়ে আনতে সহায়তা করে।
বাড়ির ছাদে অথবা বেলকনিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ফুল, ফল ও শাকসবজির বাগান গড়ে তোলাকে ছাদবাগান বলা হয়। এখানে টব, ড্রাম কিংবা ট্রেতে রোপণ করা যায় নানা জাতের ফুল, ফল ও সবজি। কেউ কেউ আবার ছাদে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করে তাতে গাছ রোপণ করেন। তবে ছাদের আকার ও সহনশীলতার দিকে লক্ষ রাখতে হবে। ছাদ যেন স্যাঁতসেঁতে হতে না পারে, সেজন্য রিং বা ইটের ওপর ড্রাম অথবা টবগুলো স্থাপন করার দিকে লক্ষ রাখতে হবে। এতে নিচ দিয়ে আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে, ছাদের ক্ষতি হয় না।
প্রয়োজনমতো ড্রাম, সিমেন্ট বা মাটির টব ও ট্রে সংগ্রহ করতে হবে। অনেক সময় বসতবাড়ির ভাঙাচোরা বালতি ও অব্যবহৃত তেলের বোতলও ছোটখাটো গাছ রোপণের জন্য ব্যবহার করা হয়। উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে এসব অব্যবহৃত জিনিস বাগানে ব্যবহার করা গেলে এটা হতে পারে এক নতুন নান্দনিকতা। চারা রোপণের আগে চারার উচ্চতা, শিকড়ের প্রকৃতি, সহিষ্ণুতা প্রভৃতির প্রতি নজর রাখতে হবে। সব গাছ ছাদবাগানের জন্য উপযুক্ত নয়। আম, কুল. পেয়ারা, লেবু, আমড়া, করমচা, ডালিম, কমলা, মাল্টা, জামরুল, নাশপাতি, জামবুরা, জলপাই এবং শাকসবজির মধ্যে লালশাক, পালংশাক, মূলাশাক, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, লেটুসপাতা, বেগুন, টমেটো, মরিচ, লাউ, শিম ইত্যাদি ছাদবাগানে চাষ করা যায়। এক্ষেত্রে নারীর রয়েছে অগ্রণী ভূমিকায়।
বর্ষা মৌসুম গাছগাছালি লাগানোর জন্য উপযুক্ত সময় হলেও সব ঋতুতেই গাছ লাগানো যায়। বাড়িতে ছাদ ছাড়াও যদি বেলকনি বা ছোট বারান্দা থাকে, সেখানেও ফুল ও শাকসবজির গাছ লাগানো যেতে পারে। এতে পুষ্টিচাহিদা পূরণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, একইসঙ্গে বাড়ির সৌন্দর্য অনেকটাই বেড়ে যায়। বৃক্ষ মানুষের প্রকৃত বন্ধু। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই নারীর সঙ্গে সবুজ প্রকৃতির রয়েছে গভীর সম্পর্ক। এ সম্পর্কের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব মনের প্রশান্তি ও বাড়তি উপার্জন।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..