পেপারলেস এনবিআর গড়ে তুলতে কাজ করব

মো. আলমগীর হোসেন ১৯৮৫ ব্যাচের কর ক্যাডারের কর্মকর্তা। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। সদ্য যোগদান করা এ কর্মকর্তাকে এনবিআরের কর তথ্য ব্যবস্থাপনা ও সেবা বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটি থেকে তথ্যপ্রযুক্তিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া এ কর্মকর্তার কর্মজীবনের সর্বশেষ কর অঞ্চল-১ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া এ কর্মকর্তা কর্মজীবনে এলটিইউসহ বিভিন্ন কর অঞ্চলে কাজ করেছেন। তিনি কর অঞ্চল-৯, কর অঞ্চল গাজীপুর প্রতিষ্ঠাসহ কর বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ক্ষেত্রে ভ‚মিকা রাখেন। সদ্য যোগদান করা এ কর্মকর্তা সম্প্রতি দৈনিক শেয়ার বিজের মুখোমুখি হয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার রহমত রহমান

শেয়ার বিজ: এনবিআরের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে কেমন লাগছে?

মো. আলমগীর হোসেন: আমাকে ডিজিটাল আয়কর বিভাগ গড়া ও করদাতাদের সর্বোচ্চ করসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। করদাতারা এ বিভাগের প্রাণ। প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ প্রতিশ্রæতি হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম পন্থা হচ্ছে ডিজিটাল এনবিআর এবং কর বিভাগ। আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করব। সবার সহযোগিতা নিয়ে কর বিভাগকে ডিজিটাল করার চেষ্টা করব। করদাতাদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, তা দূর করার মাধ্যমে একটি আধুনিক কর বিভাগ গঠনে কাজ করব।

শেয়ার বিজ: রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে কোথায় দেখতে চান?

মো. আলমগীর হোসেন: সরকার দেশকে উন্নত দেশে উন্নীত করার কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমৃদ্ধ ও আধুনিক হতে হবে। আধুনিক প্রতিষ্ঠান হলো- সমকালীন যে তথ্যপ্রযুক্তি, মেধা, মানবসম্পদ আছে তার সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করা। অর্পিত দায়িত্বটা কি? দায়িত্ব হলো শুধু রাজস্ব আহরণ না। রাজস্ব আহরণ হচ্ছে যৌক্তিক, ন্যায়ভিত্তিক। জোর করে রাজস্ব বাড়িয়ে ফেললাম তা না। যার যতটুকু কর হওয়া উচিত সে পরিমাণ করটুকু আহরণ করা। আর করদাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, উন্নত করসেবা প্রদান। উন্নত করসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি ও ট্যাক্সপেয়ার অ্যাডুকেশন থাকতে পারে। এসব প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারলে এবং দক্ষতা, গতিশীলতা বৃদ্ধি করতে পারলে এনবিআর একটি উন্নত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াবে। এনবিআরকে এ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিদেশি সাহায্যের ওপর আমরা নির্ভরশীল না’। পদ্মাসেতু আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছে বলে বিদেশিদের কাছে আমাদের সম্মান বেড়েছে। আমরা সাহায্যের জন্য এখন আর হাত বাড়ায় না। আমরা স্বাবলম্বী হচ্ছি। স্বাবলম্বী হতে হলে নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে। আয় বাড়াতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করতে হবে। আমরা রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করতে চাই।

শেয়ার বিজ: কর বিভাগকে আধুনিক করার ক্ষেত্রে আপনার পরিকল্পনা কী?

মো. আলমগীর হোসেন: সম্মানিত করদাতা, নীতিনির্ধারক, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় যারা জড়িত, সবার সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। আমার পরিকল্পনার হলো সব করদাতা যেন সাবলীলভাবে অনলাইন রিটার্ন দাখিল করতে পারে, তার জন্য উদ্যোগ নেওয়া। রিটার্ন দাখিলকে জনপ্রিয় করতে ব্যবস্থা নেওয়া। অনলাইন রিটার্ন দাখিল, অনলাইনে কর প্রদান, অনলাইনে ই-টিআইএন সেবা আরও নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং মানসম্পন্ন করা। আর একটি হলো ইন্টারন্যাল যে তথ্য ব্যবস্থাপনা তা উন্নত করা। বিশেষ করে এখন যে পেপারবেজ ওয়ার্ক হচ্ছে এ পেপারবেজ ওয়ার্ক থেকে বের হয়ে অনলাইনভিত্তিক বা পেপারলেস ওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

শেয়ার বিজ: অনলাইন রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি আরও সহজ করার ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন?

মো. আলমগীর হোসেন: বর্তমানে যারা রিটার্ন দাখিল করছেন তাদের বেশিরভাগ এখনও প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। কিন্তু তরুণ যারা রিটার্ন দাখিল করছেন তারা প্রযুক্তিতে এগিয়ে। অভ্যস্ত হয়ে গেলে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল সহজ। অভ্যস্ত না বলে আমরা জটিল মনে করি। রিটার্নে স্পর্শকাতর তথ্য থাকে বিধায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমাদের। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়েছে। একেবারে সহজ করতে গেলে তথ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এরপরও আমরা সহজ করার চেষ্টা করছি। তবে করদাতাদের সচেতনতা বাড়ানো, সুবিধার দিকগুলো তুলে ধরা, ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

শেয়ার বিজ : অনলাইনে কর দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করার পদক্ষেপ নেবেন কি না?

মো. আলমগীর হোসেন: অনলাইনে কর প্রদান প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করব। প্রাসঙ্গিক ব্যাপার। যদি আমি অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করি, আবার কর দিতে ব্যাংকে আসতে হয় তাহলে তো আমার জন্য একটু অসুবিধা হয়। বর্তমানে অনলাইনে পেমেন্টের অনেক সুবিধা তৈরি হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে কাজ করব।

শেয়ার বিজ: কর বিভাগকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেবেন কি না?

মো. আলমগীর হোসেন: কর বিভাগের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করব। কিভাবে কতদূর যাব, কি কি করা দরকার এ রকম একটি পরিকল্পনা নেব। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রচুর ফান্ড দিচ্ছেন। এনবিআরের কাস্টম ও ভ্যাটের জন্য প্রচুর ফান্ড এসেছে। কর বিভাগকে আধুনিক করতে প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা করব।

শেয়ার বিজ : কোনো দেশের কর বিভাগকে মডেলকে অনুসরণ করবেন কি-না?

মো. আলমগীর হোসেন: পরিকল্পনা করতে হয় নিজের অবস্থান এবং নিজে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে। তাদের পরিকল্পনা আর আমাদের পরিকল্পনা এক হবে না। তবে তারা যে প্রক্রিয়ায় শুরু করেছে সে প্রক্রিয়া তো অনুসরণ করা যেতেই পারে। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের যারাই সফলতা পেয়েছেন তাদের থেকে তো শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। নেওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ : কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে কী ধরনের কাজ করবেন?

মো. আলমগীর হোসেন: আমাদের কর্মকর্তারা নিঃসন্দেহে মেধাবী, পরিশ্রমী। তাদের বিভিন্ন বিষয়ে লেখাপড়া করে কর বিভাগের এসেছেন। দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করতে হলে একটি উন্নত প্রশিক্ষণ একাডেমি বা স্টাফ কলেজ প্রয়োজন। যেখান থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাজস্ব সৈনিক তৈরি হবে। আমাদের পূর্ণাঙ্গ একটি একাডেমির ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। কর্মকর্তাদের জন্য একটি ক্যারিয়ার প্ল্যানিং হওয়া দরকার। সবাই সব কাজ করবে কেন? যার যেখানে দক্ষতা আছে তাতে সেখানে উচ্চতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজে লাগানো উচিত। এনবিআর এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু জনবল, প্রযুক্তি ঘাটতি আছে। এসব জায়গায় দ্রুত কাজ করা দরকার।

শেয়ার বিজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মো. আলমগীর হোসেন: শেয়ার বিজ ও শেয়ার বিজ পরিবারকেও ধন্যবাদ।