‘পেশাগত দিক থেকে কোম্পানি সচিব পদটি গুরুত্বপূর্ণ’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. আতিক উল্যাহ্ মজুমদার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. আতিক উল্যাহ্ মজুমদার এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের কোম্পানি সচিব। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (অনার্স) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম (মাস্টার্স) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে অ্যাডভোকেসি সনদ অর্জন করেন

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

মো. আতিক উল্যাহ্ মজুমদার: ১৯৯০ সালের অক্টোবরে জুনিয়র লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ক্যারিয়ার শুরু করি। ১৯৯১ সালের জুন থেকে লিগ্যাল, বোর্ড অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দায়িত্বে সম্পৃক্ত হয়ে পুরোপুরিভাবে নিজেকে বিমা পেশায় যুক্ত করি। পরবর্তী সময়ে দাবি ও পুনঃ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড প্রতিষ্ঠার আইনগত বিষয়াদিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করে কোম্পানির অনুমোদন প্রাপ্তির দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করি। ২০০০ সালের মে মাস থেকে এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডে কোম্পানি সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: কোম্পানি সচিব পেশাকে কেন বেছে নিলেন?

আতিক উল্যাহ: বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে ভর্তি হয়েছিলাম আইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত পেশাকে গ্রহণ করব বলে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে আইনজীবী পেশার সনদ নিয়ে আইন পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করলেও ১৯৯০ সালে বিমা কোম্পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর দীর্ঘ ১০ বছরের প্রস্তুতিতে ২০০০ সালে কোম্পানি সচিব পেশাকে বেছে নিই। কোম্পানি সচিব একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। এ পেশায় একদিকে যেমন আইনি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জনের সুযোগ রয়েছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানের আইনি অভিভাবক ও মুখপাত্র হিসেবে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার সময় কোম্পানি সচিব পেশাটি আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে। তাই আইন পেশা ছেড়ে কোম্পানি সচিব হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টায় আছি। এ পদে চাকরিরত থেকেই অবসরে যাওয়ার ইচ্ছে আছে।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সচিবের সম্পর্ক কেমন?

আতিক উল্যাহ: কোম্পানি সচিব একদিকে যেমন কোম্পানির একজন ট্রাস্টি, অন্যদিকে তিনি পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সিদ্ধান্ত  গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে মুখ্য সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, শেয়ারহোল্ডার, অডিটর, রেগুলেটরি বডিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব কোম্পানি সচিবের। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে কিনা, তা দেখাশোনার দায়িত্বও তার। সুতরাং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোম্পানি সচিবের সম্পর্ক একদিকে যেমন আইনগতভাবে নির্দিষ্ট করা আছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোম্পানি সচিবের সম্পর্কটি দায়িত্ববোধ হতেও উৎসারিত।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে সচিবের ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

আতিক উল্যাহ: পেশাগত দিক থেকে কোম্পানি সচিব গুরুত্বপূর্ণ ও আইন দ্বারা পরিচালিত একটি পদ। কোম্পানি সচিবকে প্রতিষ্ঠানের চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার হিসেবেও গণ্য করা হয়। কোম্পানিতে আইন-কানুন, গভর্ন্যান্স ও কমপ্লায়েন্স যথাযথ পরিপালনের বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্বও কোম্পানি সচিবের। এছাড়া পরিচালনা পর্ষদ গৃহীত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনাগুলো এবং রেগুলেটরি বডির বিধিনিষেধ, পরামর্শ পরিপালনের দেখভালের দায়িত্ব কোম্পানি সচিবের ওপর বর্তায়। সুতরাং সামগ্রিক দিক বিবেচনায় একটি প্রতিষ্ঠানে কোম্পানি সচিবের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে সচিবের চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

আতিক উল্যাহ: কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের গৃহীত সিদ্ধান্ত আইনসম্মত, নাকি আইনের পরিপন্থিÑতা সুন্দর ও ইতিবাচকভাবে পরিচালনা পর্ষদের কাছে উপস্থাপন করাটাই সচিবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য সচিবকে আইন ও বিধিবিধানগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানসহ এসব বিষয়ে সময়ের সঙ্গে আপডেট থাকা আবশ্যক। এছাড়া শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জন করা কোম্পানি সচিবের জন্য অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। অপরদিকে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তথা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার কাজের সমন্বয় সাধন করে কোম্পানির অগ্রগতি নিশ্চিত করা কোম্পানি সচিবের জন্য কম চ্যালেঞ্জের নয়।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে আপনার মূলমন্ত্র কী?

আতিক উল্যাহ: একজন পেশাজীবীর জন্য কর্মক্ষেত্রে তার দায়িত্ব পালনে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজার রাখার মূল চাবিকাঠি হচ্ছে সততা ও কর্মনিষ্ঠা। এছাড়া সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখার সদিচ্ছা ও সহকর্মীদের সঙ্গে নলেজ শেয়ারিং এবং বিভাগীয় কাজগুলোয় সবাইকে সহায়তা করার ইতিবাচক মনোবৃত্তিই কর্মক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখার মূলমন্ত্র।

শেয়ার বিজ: কোম্পানি সচিব পেশাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আতিক উল্যাহ: কোম্পানি সচিব পেশাকে মূল্যায়নকালে প্রথমে এসে যায় কোম্পানি সচিবের দায়িত্ববোধ। এরপর আসে আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে কোম্পানি সচিবকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি হালনাগাদ তথ্য বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ

আতিক উল্যাহ: চার্টার্ড সেক্রেটারি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের সচিব হওয়া সম্ভব। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) এ ডিগ্রি দিয়ে থাকে। এছাড়া অন্য পেশার ডিগ্রি অর্জন করেও কোম্পানি সচিব পেশায় সম্পৃক্ত হতে পারেন যে কেউ। যেমন আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিং প্রভৃতি ডিগ্রি নিয়েও কোম্পানি সচিব হওয়া যায়। এ পেশায়

বুৎপত্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজন যথাযথ জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজ শেখা। অপরদিকে কোম্পানি সচিবের রেগুলেটরি বডির নিয়ম-কানুন, আদেশ-নির্দেশ, জারি করা গাইডলাইন সম্পর্কে আপডেট থাকার পাশাপাশি তা উপস্থাপনের দক্ষতা থাকতে হবে। এছাড়া কোম্পানি সচিবকে ধৈর্যশীল ও পরিশ্রমী হতে হবে।

শেয়ার বিজ: সফল কোম্পানি সচিবের কী কী গুণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন?

আতিক উল্যাহ: কোম্পানি সচিবকে সুনির্দিষ্ট কিছু গুণের অধিকারী হতে হয়। আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের পাশাপাশি কৌশলী হতে হয়। বিভিন্ন বিষয়ের চাপকে সহজভাবে নেওয়া জরুরি। ধৈর্যশীল হতে হয়। এছাড়া নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে কাজে মনোনিবেশ করা, দায়িত্ব জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া, কাজের প্রতি অটল থাকা, ধারাবাহিকভাবে কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সহকর্মীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারসহ সবার সঙ্গে সমান ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে সুসম্পর্ক স্থাপনের গুণাবলি কোম্পানি সচিবের থাকা আবশ্যক।