পোশাকশিল্পে দু-তিন বছরের জন্য উৎসে কর বন্ধ করা উচিত

নিউ এইজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম। তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পাবলিক-প্রাইভেট ডায়ালগ প্ল্যাটফরম ‘বিল্ড’। দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ব্যবসাক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের চলমান নৈরাশ্যের প্রভাব ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি তিনি শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া আফরোজ

শেয়ার বিজ: তৈরি পোশাক রফতানিকারক থেকে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মুখপাত্র হয়ে ওঠা কীভাবে পরিচয় করাবেন নিজেকে?

আসিফ ইব্রাহিম: আমি একজন তৈরি পোশাক রফতানিকারক, এটিই প্রথম পরিচয়। নিউ এইজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম শুরু করে, যা বর্তমানে দেশের শীর্ষ একশ তৈরি পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম।

আমি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯৯৩ সাল থেকে। ধীরে ধীরে ট্রেড পলিটিকসে জড়িয়ে পড়ি। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি ২০১১-১২ মেয়াদে। এ সময় আমি বাংলাদেশের প্রথম সরকারি-বেসরকারি ডায়ালগ প্ল্যাটফরম ‘বিল্ড’ প্রতিষ্ঠা করি। বিল্ডের প্রস্তাবনাগুলো গবেষণাভিত্তিক হওয়ায় সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। এ পর্যন্ত আমরা ৯টা মিটিংয়ে চার শতাধিক গবেষণা প্রস্তাব জমা দিয়েছি। এভাবে চেষ্টা করছি বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে।

শেয়ার বিজ: বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন কতটা ঘটেছে?

আসিফ ইব্রাহিম: দুর্ভাগ্যক্রমে ২০১৭ সালে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এক ধাপ অবনতি ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ অনুসারে, সহজে ব্যবসা পরিচালনার (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ তিনটা মূল জায়গায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে। চুক্তি বাস্তবায়ন, জমি ও নতুন শিল্পে ইউলিটি সংযোগসংক্রান্ত বিষয়গুলোর উন্নয়নে ইতোমধ্যে সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিডা) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিডার সঙ্গে আমরা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এবং চেষ্টা করছি বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে।

শেয়ার বিজ: আমরা দেখছি ব্যাংক খাতে তারল্যের ওঠানামা ঋণের সুদহারকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে ব্যবসায়ীর দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?

আসিফ ইব্রাহিম: অবশ্যই একজন উদ্যোক্তা হিসেবে এ পরিস্থিতি কাম্য নয়। আমরা যারা প্রকৃতপক্ষেই ব্যবসা করছি, দিনে দিনে কোণঠাসা হয়ে পড়ছি। একটা সময়ে ঋণের সুদহার ছিল ১৫-১৬ শতাংশ। অনেক বছর ধরে সরকার ও আমাদের যৌথ প্রচেষ্টার ফলে সুদহারটা এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার সুদহার এক অঙ্কে থাকছে না। এটা খুবই দুঃখজনক। ২০১৭ সালের শেষ তিন মাসে দেখা গেল ব্যাংক খাতে আমানত ৩০ হাজার কোটি টাকা আর ঋণ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার। অর্থাৎ এডি রেশিও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও অনেক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করার দরকার ছিল।

শেয়ার বিজ: ব্যাংকগুলো এখন ছোট ঋণে ঝুঁকছে শ্রেণীকৃত ঋণের ঝুঁকি সরকারের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণের তাগিদে কৌশল নেওয়া হচ্ছে এর ফলে ভবিষ্যতে বড় শিল্পের অর্থায়নে ব্যাংকনির্ভরতা কমবে বলে মনে হয় কি?

আসিফ ইব্রাহিম: টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হচ্ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ জরুরি। সুতরাং সময়ের দাবিতেই ব্যাংকগুলোর এসএমইতে অর্থায়ন বাড়াতে হবে। তবে বড় শিল্পায়নের জন্য অর্থায়ন কখনও সমস্যা হবে না। সৌভাগ্যক্রমে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বিদেশি তহবিলের সহজপ্রাপ্যতা বেড়েছে। বিদেশি তহবিলের ব্যয় কম। এটা বাংলাদেশি টাকার ঋণের বিপরীতে প্রতিযোগিতার মতো কাজ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতায় এখনও বেশ কিছু তহবিল অব্যবহƒত পড়ে আছে, যেমন ধরুন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়ে এ তহবিলগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া আমি চাই, পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী হোক। বড় শিল্পের মালিকদের মূলধন অর্জনের জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত।

শেয়ার বিজ: নিউ এইজ গ্রুপ তো পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত নয়? এর অর্থায়নের উৎস কী?

আসিফ ইব্রাহিম: না, আমরা পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত নই। তবে আমরা বিদেশি তহবিল সংগ্রহে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিনিয়োগ বোর্ডের আওতায় নির্দিষ্ট একটা কমিটি দেশীয় ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশি তহবিলগুলোর অনুমোদন দেয়। সেখান থেকে আমরা একটা তহবিলের অনুমোদন পেয়েছি। এর সুদহার বাংলাদেশি টাকার ঋণ থেকে অনেক কম। আমি আশা করব বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি এ ধরনের তহবিলের দিকে ঝুঁকবেন। যেহেতু বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদহার আবারও দশের ওপরে চলে গেছে, বিকল্প হিসেবে কম ব্যয়ের পুজি তো খুঁজতেই হবে।

শেয়ার বিজ: দেশে ব্যাংক খাতে দুর্নীতির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সে সম্পর্কে আপনার অভিমত

আসিফ ইব্রাহিম: ব্যাংক খাতের চলমান দুরবস্থা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে পীড়া দেয়। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের ভীতিকর সব তথ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখছি, এগুলো বিনিয়োগে রূপান্তরিত হচ্ছে না। সুতরাং আমি আশা করব এ ব্যাপারে সরকার বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে অসৎ ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়ছেন। সুতরাং ঋণখেলাপিদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: তৈরি পোশাকশিল্প একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বর্তমান পরিস্থিতি কতটা আশাব্যঞ্জক?

আসিফ ইব্রাহিম: তৈরি পোশাকশিল্প বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রানা প্লাজা ধসের পর অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের অনুমোদন পাওয়ার জন্য সামগ্রিকভাবে পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে পরিশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ কারণে রফতানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের বিপুল শ্রম দিতে হচ্ছে। তাদের অভিনন্দন যে, কষ্টসাধ্য এ প্রক্রিয়ায় তারা অভিযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন। আশা করি এ প্রক্রিয়াটা দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে শেষ হবে। তখন বাংলাদেশ নিরাপদ স্থান হিসেবে ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং তৈরিতে সক্ষম হবে। অতিসম্প্রতি দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের রফতানি বেড়েছে। সুতরাং পরিস্থিতি উৎসাহব্যঞ্জক হয়ে উঠছে।

শেয়ার বিজ: আমরা জানি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমালোচনা ব্যাপক অন্যান্য শিল্পের শ্রমিকদের অবস্থা কী?

আসিফ ইব্রাহিম: সার্বিকভাবে পোশাক শ্রমিকদের বেতন ও অবস্থা অন্যান্য শিল্পের শ্রমিকদের চেয়ে উন্নত। অবশ্য রফতানিনির্ভর লেদার বা ওষুধশিল্পের শ্রমিকরা ভালো অবস্থায় আছে। পোশাক শ্রমিকদের ওয়েজ বোর্ড গঠন করা আছে। প্রত্যেক বছর পাঁচ শতাংশ বাড়ছে বেতনে। মালিকদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে আবারও ওয়েজ বোর্ড ঘোষণার জন্য সবাই আলোচনায় বসবে।

শেয়ার বিজ: বাজেট আলোচনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে? কী প্রত্যাশা করছেন?

আসিফ ইব্রাহিম: তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য আমাদের কিছু প্রস্তাবনা তো সব সময় থাকে। এ শিল্প সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই অন্তত দুই থেকে তিন বছর এ খাতে সাময়িকভাবে উৎসে কর কর্তন বন্ধ করা হোক। এছাড়া গ্যাস ব্যবহার করুক বা না করুক গ্যাস সংযোগের জন্য সর্বনি¤œ মূল্য দিতে হয়। এসব জায়গায় আমাদের বিবেচনা করা উচিত। আগামী বছর নির্বাচনের বছর। আশা করছি নির্বাচনমুখী একটা বাজেটই পাব। সেক্ষেত্রে আমার ধারণা ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা আসন্ন বাজেটে অনেকটাই প্রতিফলিত হবে।

শেয়ার বিজ: শেয়ারবিজের মধ্য দিয়ে মুক্তভাবে কিছু বলতে চান কি?

আসিফ ইব্রাহিম: সম্প্রতি আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে উপনীত হয়েছি। অবশ্যই সরকারের প্রচুর কৃতিত্ব আছে। বেসরকারি খাতেরও কৃতিত্ব প্রচুর। তবে এসব উত্তরণের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাপ্ত সুবিধাগুলো সংকুচিত হবে। একে বলে ‘ইরোসোন অব প্রেফারেন্স’। এটি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে। সুতরাং আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। সামনে আরও কঠিন সময় আসবে, সেভাবে নীতিগত প্রস্তুতি নিতে হবে।

শেয়ার বিজ: ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য

আসিফ ইব্রাহিম: ধন্যবাদ।