দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

পোশাক শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে গেছে ২৬%

নিজস্ব প্রতিবেদক: তৈরি পোশাক খাতের মজুরি নিয়ে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়েছে। নতুন কাঠামোতে মজুরি বাড়েনি, উল্টো ২৬ শতাংশ কমেছে বলে দাবি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)।
গতকাল রাজধানীতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আইন অনুযায়ী প্রতিবছর পাঁচ শতাংশ হারে মজুরি বাড়ানোর নিয়ম রয়েছে। এ হিসেবে মজুরি বাড়েনি, বাস্তবিক অর্থে সার্বিকভাবে ২৬ শতাংশ কমানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা ৪৪ লাখ শ্রমিককে চাকরি দিয়েছেন বলে গর্ব করেন। প্রকৃতপক্ষে তারা লাভবান হয়েছেন। তাদের মানসিকতা বদলায়নি। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দেওয়া হচ্ছে না। গত কয়েক বছরে প্রায় এক হাজার ২০০ কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। প্রায় চার লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে। কিন্তু তাদের পাওনা দেওয়া হয়নি। এ খাতে যে অগ্রগতি হয়েছে, এটা টেকসই করার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই।’
টিআইবির সহকারী প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা ও মো. মোস্তফা কামাল উত্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের ঘোষিত মজুরি অনুযায়ী প্রথম গ্রেডে ছিল আট হাজার ৫০০ টাকা। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ঘোষিত প্রথম গ্রেডে নতুন মজুরি করা হয়েছে ১০ হাজার ৯৩৮ টাকা। কিন্তু পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্টসহ ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে মজুরি হওয়ার কথা ছিল ১৩ হাজার ৩৪৩ টাকা। সে হিসাবে মজুরি দুই হাজার ৪০৫ টাকা বা ২৮ শতাংশ কমেছে। এভাবে নতুন কাঠামোতে মজুরি সার্বিকভাবে ২৬ শতাংশ কমেছে।
মজুরি বৈষম্য প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পোশাক খাতে অনেক অগ্রগতি হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়ে গেছে। শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি পর্যাপ্ত দৃষ্টি পাচ্ছে না। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়ে গেছে। বাস্তবে মজুরি কমে গেছে বলে ধারণা করা হতো। আমাদের প্রতিবেদনেও তা উঠে এসেছে। আগের তুলনায় ২৬ শতাংশ মজুরি কমেছে। সেটি তো বাড়েইনি, বরং যারা আন্দোলন করেছেন, তাদের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে; চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’
ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে আইনি ও প্রায়োগিক দুর্বলতা রয়েছে। মাত্র তিন শতাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয়েছে, যার অধিকাংশই মালিকদের দ্বারা প্রভাবিত।’
টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের পোশাক খাতে অধিকাংশ সাব-কন্ট্রাক্টরনির্ভর কারখানায় ন্যূনতম মজুরি দেওয়া হয় না। মজুরি বৈষম্য নিয়ে আন্দোলন করায় পাঁচ হাজার শ্রমিককে আসামি করে ৩৫টি মামলা করা হয়েছে। এছাড়া ১৬৮টি কারখানায় ১০ হাজার শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘ভয়াবহ রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ষষ্ঠবার্ষিকী বুধবার (২৪ এপ্রিল)। দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত সব শ্রমিককে ন্যায্য পাওনা ও পুনর্বাসন করতে হবে। এখনও রানা প্লাজার ৫১ শতাংশ শ্রমিক বেকার রয়েছেন। শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি। রানা প্লাজার মামলা দ্রুত বিচার আইনে নিষ্পত্তি করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে মালিকপক্ষ মনে করবে, আইন অমান্য করে পার পাওয়া যায়।’
সংবাদ সম্মেলনে তৈরি পোশাক খাতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় দায়ের করা মামলা নিষ্পত্তিতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনসহ ১২ দফা সুপারিশ করে সংস্থাটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: তৈরি পোশাক খাতে তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য একক কর্তৃপক্ষ গঠন করা, শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে নিয়োগকারীর একচ্ছত্র ক্ষমতা বিলোপ করা, শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বৃদ্ধি করা, শ্রম অধিদফতরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শ্রমিক আন্দোলন-পরবর্তী চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহালের ব্যবস্থা গ্রহণ ও দায়ের করা উদ্দেশ্যমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার, ত্রিপক্ষীয় কাউন্সিল কার্যকরের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট কার্যবিধি প্রণয়ন; সরকার, বায়ার ও আইএলওর সমন্বিত উদ্যোগে আরসিসির আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

সর্বশেষ..



/* ]]> */