পোস্টার বিনষ্ট করছে রাজধানীর সৌন্দর্য

হাসান সাইদুল: সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামল আমাদের এই বাংলাদেশ। এ দেশের গাছ-গাছালি আর শস্য-শ্যামলার বেশিরভাগই সবুজ। ফসলের মাঠের যেদিকেযায় শুধু সবুজের সমারোহ। এজন্য আমাদের বাংলাদেশকে চির সবুজের দেশ বলা হতো একটা সময়। কিন্তু আজকাল চির সবুজের দেশ বলতে আমরা নিজেরাই ভুলে যাচ্ছি। চলতে-ফিরতে আমরাই নিজের সৌন্দর্যকে ধ্বংস করছি। ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা। বিশ্বের ৯১টি দেশের এক হাজার ৬০০ শহরের সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার ২৫টি শহর। এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। এতে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও রাজধানী ঢাকার নাম।

চির সবুজ এ দেশের রাজধানী ও প্রধান শহর ঢাকা। দিন যত যাচ্ছে এ মহানগরীর সার্বিক সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে। এই শহরে আগে নিয়ম ছিল খুব ভোরবেলা ময়লা-বর্জ্যরে গাড়ি এসে ময়লা তুলে নেবে এবং ভোর থাকতে থাকতেই অর্থাৎ মানুষজন চলাচল শুরু করার আগেই ময়লা নিয়ে চলে যাবে। এখন আধুনিক যুগে আর সে নিয়ম নেই। এখন ময়লার গাড়ি কাজে নামে বেশ বেলা করে, লোকজন চলাচল শুরু করার পর। এ শহরের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সবাই ‘সরকারি’ কর্মচারী। তাই তাদের চাকরি যাওয়ার কোনো ভয় নেই। কাজ করলে ভালো। না করলে আরও ভালো। কেউ টিকিটি ছুঁয়ে দেখবে না। তারা দলবেঁধে সাতসকালেই রাস্তায় চলে আসেন। এসে প্রাগৈতিহাসিক সেই মুড়ো-ঝাঁটা দিয়েই ঝাড়– দিতে থাকেন। এ এক অসমাপ্ত আরব্য রজনীর গল্পের মতো, যার কোনো সমাপ্তি নেই। ঘটে চলছে তো চলছেই। কেউ কিছু বলার নেই, কেউ কিছু ছোঁয়ারও নেই। বলবেই বা কাকে? এমন হাজারো প্রশ্ন, উত্তরও সবার জানা।

ধুলায় ধূসরিত হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকা। প্রতিটি সড়ক, অলিগলি এখন ধূলিময়। বিভিন্ন সড়কের বেসরকারি-সরকারি সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি, গগনচুম্বী বহুতল ভবনের নির্মাণসহ নানা কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। দিনের পর দিন ঢাকা শহরে গড়ে উঠছে বড় বড় বিলবোর্ড। ঢাকার সরু অলিগলিতে এখন আর পরিষ্কার কোনো জায়গা পাওয়া কঠিন। সৌন্দর্যের বড় অন্তরায় হলো পোস্টার। বর্তমানে আমাদের ঢাকার যেদিকে চোখ রাখা হোক পোস্টার-ব্যানার ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। টু-লেট, ভাড়া হবে, নানা রকম বিজ্ঞপ্তির আড়ত মনে হয় আমাদের এই ঢাকা। রয়েছে ইন্টারনেট, ডিশ সংযোগের কেবলের জঞ্জাল। রাজধানী ঢাকা শহরে যেখানেই হোক একটি ছোট দেয়াল কিংবা ঢাল উঠলেই দু’একদিন পর সেখানে পোস্টার আর ব্যানারের ছড়াছড়ি। বিশেষ করে রাজধানীর স্কুল-কলেজের সামনে দেখা যাবে হরেকরকম বিজ্ঞপ্তি। যে কোনো বিষয়ের ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টারসহ নানারকম কাগজে মোড়ানো সব বিজ্ঞপ্তি এখন ঢাকার সব কিছুতে দেখা যায় চোখ মেললেই। ঢাকায় উন্নত জীবনের প্রত্যয় নিয়ে সবাই আসে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। কিন্তু নিজেদের জীবনের চাকা সঠিক পথে ঘুরাতে ঢাকার চাকাকে বিপথে ঘুরাচ্ছে সবাই। রাজধানীর সার্বিক সৌন্দর্য নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। যেখানে-সেখানে তার টাকা ব্যানার ঝুলানো, পছন্দমতো দেয়ালে নিজেদের বিজ্ঞাপন টানাচ্ছে; যার ফলে নষ্ট হচ্ছে ঢাকার মৌলিক সৌন্দর্য।

রিকজাভিক, আলাস্কা, সুইজারল্যান্ড, ভ্যাঙ্কুভার, অসলো, হেলসিঙ্কি, স্টকহোম, মন্ট্রিয়াল, মেলবোর্নসহ বিশ্বের সেরা বাসযোগ্য শহরগুলো কিন্তু ঢাকার আগে প্রতিষ্ঠিত (জš§) হয়নি। অথচ আমাদের এই ঢাকা এখন বাসের অযোগ্য শহর, কেন? আমরাও তো মানুষ। আমরা চাই যেখানে বাস করছি, সে জায়গাটা, সে পরিবেশটা সুন্দর হোক। চির সবুজ দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে যেন, সে সঙ্গে দেশের একশ্রেণির মানুষ প্রচার ও প্রসারের জন্য পোস্টার-ব্যানার ঝোলাতে ঝোলাতে বাসযোগ্য পরিবেশকে আরও দূষণ করে ফেলে। শহরে দালানগুলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তথা ডিশ লাইন, বিদ্যুতের তার, ইন্টারনেটের তারও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিবেশকে আরও দূষণ করছে। সরাসরি বলা চলে ঢাকার আকাশ এখন খোলা কিংবা মুক্ত নয়। বিভিন্ন গবেষণা জরিপে ঢাকাকে অনেক আগেই বাসের অযোগ্য বলা হয়েছে।  মেগা সিটির পরিবেশ ও বায়ু অনেকটা দূষিত, জল, আলো দূষিত; আরও দূষিত দেয়াল, উড়াল সেতু ও স্থাপনাগুলো। এ দূষণ থেকে নিস্তার পেতে হলে নগরবাসীকেই সচেতন যতœবান হতে হবে। নিজেরাই সোচ্চার না হলে নিজেদের আবাসস্থল বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী আরও দূষিত হবে, আধুনিক বাসযোগ্য শহর হওয়ার দৌড়ে পিছিয়েই থাকবে।

 

গণমাধ্যমকর্মী

 

[email protected]