প্রচলিত মতবাদগুলোর মুখোশ উম্মোচন

মিজানুর রহমান শেলী: তবে সবশেষে যে কথাটি বলতেই হয়, সতর্কতা জরুরি। ইদানীং আর্বিট্রেজকে খুব সহজেই গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু এটা বিনিয়োগের কোনো প্রণালি নয়। এটা বছরে ২০ শতাংশ লাভের কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। কোনো ধরনের লাভের নিশ্চয়তাও এখানে পাওয়া যায় না। বলা হয়েছিল বাজার খুব যৌক্তিকভাবেই কার্যকর বা ফলপ্রসূ, তাই আমরা গত ৬৩ বছর ধরে যে কোনো ধরনের আর্বিট্রেজ খরিদ করে নিয়েছি। এমনকি এর বেশিরভাগই ফলপ্রসূ হয়েছিল, কেননা সেগুলোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল স্বার্থকভাবে।
একজন বিনিয়োগকারী ধরাবাঁধা কোনো নির্দিষ্ট স্টাইল বা ক্যাটেগরি অনুসরণ করে কোনো স্টক ব্যবসায় বড় ধরনের লাভবান হতে পারে না। তিনি কার্যত প্রতিনিয়ত সব ধরনের ফ্যাক্টকে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে দেখবেন এবং অবশ্যই সঠিকভাবে নিয়ম মেনে চলবেন। আর এভাবেই কেবল তিনি লাভবান হতে পারেন। প্রকৃতিগতভাবেই আর্বিট্রেজ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ করা ডার্ট নিক্ষেপের মাধ্যমে কোনো পোর্টফোলিও মনোনয়ন করার চেয়ে উত্তম নয়।
যখন কোনো চমৎকার ব্যবস্থাপনা রয়েছেÑএমন কোনো চমৎকার ব্যবসার কোনো অংশের মালিক হই, তখন আমাদের প্রিয় স্বত্বাধিকরী সময়কালটা আর চিরস্থায়ী হতে বাধা থাকে না। আমরা আসলে তাদের ঠিক উল্টো চরিত্রের যারা সবসময়ই কোম্পানি যখন ভালো কার্যনৈপুণ্য দেখাতে থাকে তখন খুব তাড়াহুড়া করে থাকেন লভ্যাংশ বিক্রি করে দিতে এবং নিবন্ধ করে নিতে। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো বৈসাদৃশ্য নেই যারা কোম্পানির দুর্দিনে ব্যবসার সঙ্গে নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকে। পিটার লিঞ্চ এই চরিত্রকে যথাযথভাবে তুলনা করেছেন ‘ফুল কেটে আগাছায় জলসেচন করার’ সঙ্গে।
আমরা সবসময়ই চিন্তুা করি, এমন ব্যবসার স্বার্থের সঙ্গে অংশীদার হওয়াটা একেবারে বোকামি যে ব্যবসার সবকিছু সহজে অনুমান করা যায় এবং যার স্থায়িত্ব চমৎকার। এ ধরনের ব্যবসায় ব্যবসার স্বার্থ খুব সহজে পরিবর্তন করা যায় না।
মজার ব্যাপার হলো, করপোরেট ম্যানেজারদের পরিচালিত ব্যবসার যে বিষয়টিকে তারা সামনে আনতে চান সেগুলোকে ঠিকঠাক বুঝে নিতে তাদের কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না: একটি মাতৃ কোম্পানি যা একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থ-কারবারের ভর্তুকির মালিক হয়ে থাকে তারা দামদরকে পাত্তা না দিয়ে সম্ভবত তার স্বত্ব ধরে রাখতেই পছন্দ করে থাকে। ‘কেন’, একজন সিইও প্রশ্ন করতে পারেন, ‘আমার মুকুট মণির অংশীদার হওয়া কি উচিত?’ তথাপিও সেই একই সিইও’র কাছে তার নিজের পোর্টফোলিও বিনিয়োগ চলে আসে তখন সে কোনো কিছু চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই বেগবান হয়ে ব্যবসায়ের আদ্যোপান্ত ঘোরাঘুরি শুরু করে। অথচ এ সময়ে বাহ্যিক কিছু বৈশিষ্ট্য ছাড়া আর কিছুই ব্যবসাটি সম্পর্কে তার দালাল কোনো তথ্য উপস্থাপন করে না। আর তাতেই ওই সিইও খুব আগ্রহ নিয়েই কাজ শুরু করে। এটার সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, ‘আপনি লাভ নিয়ে সর্বস্বান্ত হতে পারেন না’। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন একজন সিইও তার বোর্ডের সামনে একটি চমৎকার সাবসিডিয়ারি বিক্রি করার যুক্তি হিসেবে এ বাক্যটি ব্যবহার করেন? আমাদের দৃষ্টিতে যা কিছু একটি ব্যবসায় উপলব্ধি তৈরি করে তাই তার স্টকে উপলব্ধি তৈরি করতে সক্ষম হয়: একজন বিনিয়োগকারীর উচিত সাধারণভাবে একটি চমৎকার ব্যবসার ছোট একটি অংশ হলেও ধরে রাখা। এমনকি এই ছোট্ট মালিকানা এমনভাবে ধরে রাখতে হবে যেমন করে এরকম কোনো ব্যবসার একজন একক মালিক তার মালিকানা ধরে রাখতে একাট্টা বা অটল অবস্থানে থাকেন।
আগে আমি উল্লেখ করেছি, ১৯১৯ সালে কোকা-কোলাতে ৪০ ডলার বিনিয়োগের আর্থিক ফলাফল কী দাঁড়িয়েছিল। কোকা-কোলার উদ্বোধনের ৫০ বছরের বেশি সময় পরে ১৯৩৮ সালের কথা, এসময় কোকা-কোলা একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভালোভাবে স্থায়িত্ব পেয়ে গিয়েছিল। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বুকে একটি আমেরিকান আইকনে রূপ লাভ করে। এ সময় ফরচুন এই কোম্পানি নিয়ে একটি দারুণ প্রবন্ধ ছাপাল। প্রবন্ধটির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রতি বছর কয়েক বার করে একজন ভারি ও গম্ভীর বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি আশা নিয়ে এবং গভীর সম্মানের সঙ্গে কোকা-কোলার রেকর্ডকে অবলোকন করে, কিন্তু অনুশোচনা নিয়ে উপসংহারে ফিরে আসে যেন সে যা কিছু দেখছে তা খুব দেরি করে দেখছে। সম্পৃক্তি আর প্রতিযোগিতার অপচ্ছায়া যেন তার মুখের সামনে এসে পর্দা ফেলে দেয়।’
হ্যাঁ, ১৯৩৮ সালে এখানে একটি ভালো প্রতিযোগিতা বেধে থাকত। ১৯৩৯ সালেও তাই। কিন্তু একটি বিষয় খুব মূল্যবান হয়ে সবার চোখে ধরা পড়ল, ১৯৩৮ সালে কোকা-কোলা ২০৭ মিলিয়ন বোতল কোমল পানীয় বিক্রি করেছিল, কিন্তু ১৯৯৩ সালে তারা ১০.৭ বিলিয়ন বোতল কোমল পানীয় বিক্রি করতে সক্ষম হলো। এটা ১৯৩৮ সালের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি বিক্রির একটি নজির বয়ে আনল সবার নজরে। উল্লেখ্য, ১৯৩৮ সালে তারা ২০৭ মিলিয়ন বোতল বিক্রি করে একটি একচেটিয়া আধিপত্যে পৌঁছে গিয়েছিল, তার ওপর আবার ৫০ গুণ অগ্রবর্তী হয়ে তারা আরও বেশি আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়ে উঠল। একটি প্রধান শিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো। ১৯১৯ সালে তাদের কোনো অংশীদার ছিল না। এ সময় তারা ৪০ ডলার বিনিয়োগ করেছিল। ১৯৩৮ সালে এই ৪০ ডলার লভ্যাংশের পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে তিন হাজার ২৭৭ ডলারে উপনীত হলো। আর ১৯৯৩ সালে এই বিনিয়োগ পৌঁছে গেল ২৫ হাজার ডলারে।
১৯৩৮ সালের ফরচুনের করা প্রতিবেদনের আরও অনেক কথা আমি এখানে উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। ‘কোকা-কোলা এবং তার বিক্রির পরিধি পরিমাপে আর কোনো কোম্পানিকে তুলনা করতে যদি চাই তবে তার মুখে আনা দুষ্কর হয়ে যায়। কোকা-কোলা যা করেছে তা বিস্ময়কর। এর পণ্যের গুণে-মানে আসলেই কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে ১০ বছরের মধ্যে কোনো অপরিবর্তনীয় পণ্যের নাম বলতে গেলে কোকা-কোলার পাশে আর কোনো কোম্পানির নাম উল্লেখ করা যায় না।’
গত ৫৫ বছরে যা অতীত হয়েছে, তাতে কোকের পণ্য নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কার্যত এর পরিধি বেড়ে চলেছে কোনো না কোনোভাবে। তবুও কোকা-কোলার ক্ষেত্রে এই বর্ণনাটি দেওয়া আসলে খুব দুষ্কর কিন্তু বাস্তব যে, তাদের পণ্যের কোনো পরিবর্তন এখনও ঘটেনি। আবার বাজারে এর চাহিদাও এখনও আগের মতোই বহাল তবিয়তে রয়েছে।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।