ধারাবাহিক

প্রচলিত মতবাদগুলোর মুখোশ উম্মোচন

মিজানুর রহমান শেলী: আমরা খুব স্বপ্রণোদিত হয়েই কোম্পানির মূল্য ইতিহাস বা নথি জানার জন্য অগ্রবর্তী হয়ে থাকি। এমনকি কোম্পানি সম্পর্কে এমন আর কী কী তথ্য রয়েছে, যা আমাদের ওই কোম্পানি সম্পর্কে জানা, বোঝা বা উপলব্ধির জন্য সহায়ক হতে পারে তার অনুসন্ধান চালিয়ে থাকি। সে যে তথ্যই হোক ছোট কিংবা বড়, গুরুত্বহীন বা গুরুত্বাবাহী তার সবকিছুকেই আমরা সম্মান করি। একটি স্টক আমাদের কেনা পরে, ধারাবাহিকভাবে, তাই আমরা কখনোই বিরক্তি বোধ করি না। যদি সে কোম্পানির অবস্থা আরও বেশি খারাপ হয়ে যায়, এমনকি কোম্পানিটি যদি দু বা এক বছরের জন্য বন্ধ হয়েও থাকে তাতে আমরা অনুতাপ করি না। বিরক্ত হই না। কার্যত আমাদের নিয়ম করে প্রতিদিনের ১০০ ভাগ উন্নতির নথি বিশ্লেষণ বা ব্যবচ্ছেদ করার প্রয়োজন নেই। সি’স বা এইচ এইচ ব্রাউন আমাদের প্রতিদিনের উন্নয়নের যে চর্বিত চর্বণ করে থাকে তা নিয়ে আমাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই বিশেষ করে এসব স্টক বিনিয়োগে। তাহলে আমরা কোকের সাত শতাংশ সুদ নিয়ে কেন কথা বলব?
আমাদের মতে, সত্যিকার ঝুঁকিটা কী বুঝে নিতে হবে: আসলে সত্যিকার ঝুঁকিটা হলো, একজন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ ট্যাক্স পরিশোধের পর থেকে অর্জিত থোক এবং যা সে তার মূল্য ছাড়ের বিক্রয় থেকে অর্জন করেছে তা তার কাক্সিক্ষত হোল্ডিং পিরিয়ডের মধ্যে তাকে কমপক্ষে সেই সক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে কি না, যা দিয়ে তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন এবং প্রাথমিক কালের যথাযথ সুদের হার সে ফিরে পাবে কি না। এই ঝুঁকি আসলে পরিমাপ করা যায় না, যতই পরিকল্পিত ইঞ্জিনিয়ারিং সূচক ও হাতিয়ার সেখানে ব্যবহার করা হয় না কেন। তবে শুদ্ধতার পরিমাণ বা মাত্র কখনও কখনও বিচার করা যায় তার উপকারিতা বা উপযোগিতার ভিত্তিতে। এই মূল্যায়নের প্রাথমিক ফ্যাক্টরগুলো নিচে দেওয়া হলো:
একটি বিনিয়োগ শুরু করার আগে সেই কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চরিত্রের নিশ্চয়তা যাচাই-বাছাই করা জরুরি।
যারা এই কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় থাকবে তাদের নিশ্চয়তা যাচাই-বাছাই করতে হবে। এই দুটি মূল্যায়নের মাধ্যমে ব্যবসায় কোম্পানিটির সম্ভাবনা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে এবং এর ক্যাশ প্রবাহ কতটা দক্ষতা আর বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালিত হয় তা নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
ব্যবস্থাপনা দলের পুরস্কার বা পরিতোষকের নিশ্চয়তা যাচাই করতে হবে। দেখতে হবে এই পরিতোষক কোম্পানি নিজেই দেবে নাকি শেয়ারহোল্ডাররাও দেবে।
ব্যবসাটির ক্রয় মূল্য মূল্যায়ন করতে হবে।
কোম্পানিটির ট্যাক্স ও মুদ্রাস্ফীতি বিচার করতে হবে। এটা ভবিষ্যতেও ক্রিয়াশীল থাকবে। এমনকি এর মাধ্যমে নির্ধারণ হবে বিনিয়োগকারীর ক্রয়-ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সক্ষমতা কোন মাত্রায় স্থির থাকবে। আর এটা তার গ্রস রিটার্নের কাটতি অংশ।
এ ফ্যাক্টরগুলো সম্ভবত অনেক বিশেষজ্ঞকে খুব আহত করবে। তারা বেশ বিস্মিত হবেন। তাদের কাছে অসহনীয় ঝাপসা যুক্তিবিজ্ঞান বলে মনে হবে। কেননা তারা যে কোনো প্রকার ডেটা বেইসের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারে না। কিন্তু সঠিকভাবে এসব বিষয়-আশয়ের সংখ্যায়ন তাদের গুরুত্বকে বাতিল করতে পারে না আবার তাকে দমন করতেও পারে না। এটা জাস্টিস স্টিউয়ার্টের আাবিষ্কারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তিনি চিন্তাভাবনা করে উপলব্ধি করেছিলেন অশ্লীলতা পরীক্ষা করার জন্য, কোনো সূত্র আবিষ্কার করা আসলেই দুরূহ ব্যাপার। তবু তিনি দাবি করেছিলেন, ‘আমি জানি এটা যখন আতি এটা দেখি’। তাই একজন বিনিয়োগকারীও এটা দেখতে পায় বা জানতে পারে খুব চমৎকার উপায়ে, আবার সেটা খুব উপযোগীও হয়। বিনিয়োগকারী তাই দেখতে পায় কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগের সঙ্গে ঘাপটি মেরে লেগে থাকা ঝুঁকিগুলো। এক্ষেত্রে কোনো জটিল সমীকরণ বা কোনো মূল্য ইতিহাস দেখতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
এখন এটা কীভাবে বলা যাবে যে কোকা-কোলা ও জিলেটের ব্যবসায় ঝুঁকি অন্য যে কোনো ব্যবসায় কোম্পানির চেয়ে অনেক কম? আসলে এটা বলতে পারা সত্যিকারেই কঠিন কাজ। সারাবিশ্বে যে পরিমাণ কোমল পানীয় বিক্রি হয় তার ৪৪ শতাংশ বিক্রি হয় এই এই কোকা-কোলা। আবার সারা পৃথিবীতে যত ব্লেড ব্যবহার হয় অর্থাৎ ব্লেইডের বাজারে জিলেটের অংশ রয়েছে ৬০ ভাগের বেশি। মূল্য ভিত্তিতে। চুইং গামকে যদি পাশে রাখা যায়, রিগলিকে আধিপত্যের আসনে বসাতে হবে। আমার জানা মতে, এর চেয়ে আরও বড় ও ভালো কোম্পানি পৃথিবীতে আছে কি না, যা সারাবিশ্বে একচেটিয়া ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করে আছে। একটি বিশ্ব শক্তি অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
উপরন্তু, কোক ও জিলেট উভয়েই তাদের ব্যবসাকে পৃথিবীজুড়ে এই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আরও বেশি বাড়িয়ে নিয়েছে। এটা হলো তাদের ব্যান্ডের নামের একটি প্রভাব বা শক্তি। এর সঙ্গে রয়েছে তাদের পণ্যের গুণ-বৈশিষ্ট্যের পরিচিতি। তাছাড়া তাদের বিপণন ব্যবস্থার চমৎকারিত্ব এখানে খুবই কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। ফলে তারা ধীরে ধীরে একটি অদম্য অপ্রতিরোধ্য ব্যবসায় প্রতিযোগিতায় লড়তে শিখে ফেলেছে। আর এর সবই কোম্পানি দুটোকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। বস্তুত তারা তাদের আর্থিক দুর্গ-কেল্লার চারদিকে এক কঠিন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতেও সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে, গড়পড়তা অনেক কোম্পানির কথা বলা যেতে পারে, এরা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে তাদের কেল্লার গায়ে। কেবলই নিজেদের নিরাপত্তার লড়াই। পিটার লিঞ্চের ভাষায় বলতে হয়, একটি কোম্পানির বিক্রয়যোগ্য ভোগ্য পণ্যের স্টকগুলোর একটি সতর্কতার মাত্রা থাকা উচিত। তিনি বলেন: ‘প্রতিযোগিতা মানবসম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।’
কোক ও জিলেটের প্রতিযোগিতা শক্তির দিকে যদি তাকাই তবে দেখতে পাব এই প্রতিযোগিতাটি একটি নির্দিষ্ট মাত্রা থেকে অনিয়মিত মাত্রা অবধি বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। তথাপিও তাদের স্টকের বেটা সেসব বিভিন্ন ধরনের কোম্পানির মতোই যাদের তেমন উল্লেখ করার মতো প্রতিযোগিতা নেই। কখনও কখনও হালকা প্রতিযোগিতা সুবিধা পেয়ে থাকে। তাহলে এ সূত্র ধরে আমরা এই উপসংহারে আসতে পারি যে, কোক বা জিলেটের প্রতিযোগী ক্ষমতা থাকার পরও তারা ব্যবসায় ঝুঁকির বিচারে খুব বেশি লাভবান হতে পারেনি বা কিছুই অর্জন করতে পারেনি। অথবা এ উপসংহারেও আসা যেতে পারে কি, কোনো কোম্পানির কিছু অংশের স্টকের মালিক হওয়ার ঝুঁকি যে কোনোভাবেই হোক ওই ব্যবসার মাঝে ঘাপটি মেরে লেগে থাকা দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ঝুঁকি থেকে বিচ্ছিন্ন? আমরা বিশ্বাস করি এই দুটো অনুসিদ্ধান্তের কোনোটাই সত্য হতে পারে না বা কোনো উপলব্ধি নির্মাণ করে না। আবার বিনিয়োগ ঝুঁকির সঙ্গে এটার বেটা গণনাতেও কোনো উপলব্ধি তৈরি করে না।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।

সর্বশেষ..



/* ]]> */