মার্কেটওয়াচ

প্রণোদনায় বাজার ভালো করা যাবে না

ব্যাংক খাতের দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে যেমন ব্যাংক খাত ভালো হবে না; অন্যদিকে বাজারও ভালো করা যাবে না। কারণ, মানি ও ক্যাপিটাল মার্কেট উভয়ে একে ওপরের সঙ্গে জড়িত। বাজার ভালো করতে হলে ব্যাংক থেকে যে অর্থ সরবরাহ করা হয়, সেটি সঠিক সময়ে আসতে হবে এবং সঠিকভাবে প্রণয়ন করতে হবে। আবার ব্যাংক থেকে বাজারে যে অর্থ বিনিয়োগ হয়, সেটির ক্ষেত্রে কিছু নিয়মের পরিবর্তন আনতে হবে, তাহলে বাজার হয়তো কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে। শুধু প্রণোদনা দিয়ে বা প্লেসমেন্ট, আইপিও শেয়ার বন্ধ করে বাজার ভালো করা যাবে না। গতকাল এনটিভির মার্কেট ওয়াচ অনুষ্ঠানে বিষয়টি আলোচিত হয়।
আহমেদ রশীদ লালীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ৭১ টেলিভিশনের সিনিয়র বিজনেস এডিটর কাজী আজিজুল ইসলাম এবং আইআইডিএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও সালেহ আহমেদ ও বালি সিকিউরিটিজের পরিচালক মো. আরিফুর রহমান।
কাজী আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে মূল চালিকাশক্তি ব্যাংক খাত। কিন্তু ব্যাংক খাতের অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে। এর মূল কারণ ব্যাংক খাতের দুর্নীতি। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যাংকের মধ্যে ১৪টির নগদ প্রবাহ নেতিবাচক আর ২২টির প্রভিশন রাখার সক্ষমতা নেই। এটি ব্যাংক খাতের জন্য অশনিসংকেত। শুধু ব্যাংক খাতই নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও বিপদসংকেত। এ খাতে অস্থিরতা, অরাজকতা ও অক্ষমতার বিন্যাস হচ্ছে। এর জন্য বাজারে প্রভাব পড়ছে। এ বিষয়গুলো সরকারকেই দেখতে এবং এর দায়ভারও বহন করতে হবে। অতিদ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আবার ব্যাংকগুলো অর্থনীতির সঙ্গে চলছে না। দেশের অর্থনীতি এগোচ্ছে এবং ২০৩০ সালে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে। যারা ব্যাংক খাতে লুটপাট ও অস্থিরতা তৈরি করেছে, তাদের কাছ থেকে জনগণ জবাবদিহিতা নেবে না। জবাবদিহিতার অপেক্ষায় থাকবে সরকারের কাছে। তিনি আরও বলেন, প্রণোদনা শব্দটি বাজার থেকে উঠিয়ে দেওয়া উচিত। প্রণোদনা পাবে কারা? বিশেষ করে যারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, নতুন ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং যেখানে ঝুঁকি রয়েছেÑতাদের জন্য প্রণোদনা হতে পারে। কিন্তু জনগণের টাকায় প্রণোদনা দেবে এটি বিশ্বের কোনো পুঁজিবাজারে আছে বলে মনে হয় না। বাজারে পলিসি সাপোর্ট থাকতে পারে, যেটি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে পারে। বাজার ভালো করার জন্য সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। যেভাবেই হোক, দেশে ব্যবসা করলে কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসতে বাধ্য করতে হবে। এ ধরনের পরিকল্পনা সরকারের থাকতে হবে। যতদিন পর্যন্ত বাজারে ইকুইটির সংখ্যা ১০০০ না হবে, ততদিন পর্যন্ত বাজার ভালো করা যাবে না।
সালেহ আহমেদ বলেন, এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে খেলাপিদের বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যারা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেছে, তারা এখন বলছে ঋণখেলাপি হওয়াই ভালো। এটি কিন্তু ব্যাংক খাতের জন্য, অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের জন্য সুখকর নয়। এখান থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
মো. আরিফুর রহমান বলেন, ব্যাংক হচ্ছে অর্থের বাজার। ব্যাংক থেকে অর্থ আসবে এবং সেখান থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হবে এটাই স্বাভাবিক এবং অন্যান্য খাতেও যাবে। কথা হচ্ছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বাজার সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। যদি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে পরিচালনা ও অর্থ সংগ্রহ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে বাজার ভালো করা যাবে না। এতে বাজার ক্রমান্বয়ে আরও খারাপের দিকে যাবে। বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যাংক ঋণখেলাপি। ধীরে ধীরে সব ব্যাংকই যদি ঋণখেলাপি হয়, একদিন দেখা যাবে বাংলাদেশই খেলাপি হয়ে যাবে এটি অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। অতএব, আমরা যতই বলি দেশের অর্থনীতি ভালো এবং আরও অগ্রসর হবে এটি সত্য। কিন্তু ব্যাংক খাতের দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে যেমন ব্যাংক খাত ভালো হবে না; অন্যদিকে বাজারও ভালো করা যাবে না। কারণ, মানি ও ক্যাপিটাল মার্কেট উভয়ে একে ওপরের সঙ্গে জড়িত। বাজার ভালো করতে হলে ব্যাংক থেকে যে অর্থ সরবরাহ করা হয়, সেটি সঠিক সময়ে আসতে হবে এবং সঠিকভাবে প্রণয়ন করতে হবে। আবার ব্যাংক থেকে বাজারে যে অর্থ বিনিয়োগ হয়, সেক্ষেত্রে কিছু নিয়মের পরিবর্তন আনতে হবে, তাহলেই বাজার হয়তো কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে। শুধু প্রণোদনা দিয়ে বা প্লেসমেন্ট, আইপিও শেয়ার বন্ধ করে বাজার ভালো করা যাবে না।

শ্রুতিলিখন: শিপন আহমেদ

সর্বশেষ..