প্রচ্ছদ প্রথম পাতা সাক্ষাৎকার

‘প্রণোদনা পেলে উন্নয়নের চালিকাশক্তি হবে আবাসনশিল্প’

১৯৮৮ সালে দুই প্রকৌশলী বন্ধুর হাত ধরে শেল্টেক (প্রাইভেট) লিমিটেড কোম্পানির পথচলা শুরু। গত তিন দশকেই আবাসন খাতের শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় নাম লিখিয়েছে শেল্টেক। প্রতিষ্ঠানটির দুই সফল উদ্যোক্তার একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. তৌফিক এম. সেরাজ। তিনি শেল্টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আবাসন খাতের চলমান সময় ও শেল্টেকের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পলাশ শরিফ

শেয়ার বিজ: দেশের আবাসন খাতের বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন?
ড. তৌফিক এম. সেরাজ: আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা ছিল। মূলত ২০১২ সালের পর এ খাতে ব্যবসায় ধস নেমেছিল। কয়েক বছর ধরে এ খাতে স্থবিরতা চলছিল। তবে ২০১৭ সালের পর কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এখন আর বাজার নিচের দিকে যাচ্ছে না। সে হিসেবে দেখলে আমাদের আবাসন খাত ধীরগতিতে হলেও একটি ক্রান্তিকাল কাটিয়ে উঠছে। যে কারণে আমরা আশার আলো দেখছি। এ অবস্থায় সঠিক সময়ে সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া হলে আবাসন খাত এগিয়ে যাবে।

শেয়ার বিজ: আবাসন ব্যবসায় দীর্ঘ মন্দা-স্থবিরতার পেছনের কারণগুলো কী কী?
তৌফিক এম. সেরাজ: আবাসন মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই সবাই যার যার মতো করে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে নেয়। নিজের জন্য প্লট-ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। কিন্তু আগ্রহের তুলনায় মানুষের সামর্থ্য কম। কেউ চাইলেও প্লট-ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। যে কারণে আমি দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি। ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে ব্যবসা বাড়বে। সে সঙ্গে সুদিন ফেরাতে স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ দরকার। তাহলে যত প্রতিবন্ধকতাই থাকুক না কেন, মানুষের সক্ষমতা বাড়বে। মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে আসবে।

শেয়ার বিজ: আপনারা যে আশার আলো দেখছেন, তাকে পরিপূর্ণতা দিতে করণীয় কী?
তৌফিক এম. সেরাজ: সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়াসহ সরকারের কয়েকটি পদক্ষেপ ইতিবাচক হিসেবে এসেছে। যা ঘুরে দাঁড়ানো ত্বরান্বিত করছে। এ অবস্থায় আবাসন খাতকে এগিয়ে নিতে আরও কিছু ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তথা সহায়তা দরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা। সে সঙ্গে আবাসন খাতে বিদ্যমান পলিসিগত জটিলতা কাটিয়ে ওঠাও দরকার। এজন্য খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে বিদ্যমান সংকট চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ বের করা দরকার। এর মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশে রেজিস্ট্রেশন খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। তাই খরচ বেড়ে যায়। ফ্ল্যাটের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে; এদিকে সরকারের নজর দিতে হবে। রেজিস্ট্রেশন খরচ কমলে ফ্ল্যাটের দামও কমে আসবে। এসব কারণেই আমাদের আবাসন খাতে সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে ওঠেনি। এখানে সেভাবে ফ্ল্যাট হাতবদল হয় না। সে সঙ্গে এ খাতে ভালো করছে, আইন-কানুন মেনে চলছে এমন কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্রের তরফে প্রণোদনা দেওয়া দরকার।

শেয়ার বিজ: আবাসন এখন শিল্প। কিন্তু শিল্প হিসেবে সরকারের তরফ থেকে যেসব সুবিধা-প্রণোদনা পাওয়ার কথা, সেগুলো পাচ্ছে কী?
তৌফিক এম. সেরাজ: আবাসন খাত আমাদের দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তাই এ খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে আমরা সব সময় সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছি। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে আবাসন খাতের জন্য সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এখন সরকারিভাবে আবাসনকে শিল্প বলা হচ্ছে; কিন্তু আবাসনশিল্প প্রাপ্য অনেক ক্ষেত্রেই সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমরা আবাসন খাতের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কথা বলেছি। বিশেষ ঋণের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ তহবিল রাখার কথা বলেছি। কিন্তু এসব ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এখনও আবাসনকে ‘অনুৎপাদনশীল খাত’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এসব কারণে আবাসন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যায়। আবাসনের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে এ খাত মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে তা আর্থসামাজিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

শেয়ার বিজ: আবাসনশিল্পে গতি ফেরাতে সাধারণ ক্রেতা বা গ্রাহকের ভূমিকা কি হতে পারে?
তৌফিক এম. সেরাজ: আবাসন খাতকে এগিয়ে নিতে হলে সাধারণ ক্রেতার সচেতনতার বিকল্প নেই। তাদের জেনে-বুঝে প্লট-ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাহারি বিজ্ঞাপন দেখে কোনো কিছু কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সেক্ষেত্রে গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে না, বরং বাড়বে। আমাদের আবাসন খাতের কোম্পানিগুলোর রেটিং করা হলে গ্রাহকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ সুগম হবে। কোম্পানিগুলোও রেটিংয়ে এগিয়ে থাকতে পদক্ষেপ নেবে।

শেয়ার বিজ: শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি হিসেবে শেল্টেক-এর পথচলা সম্পর্কে কিছু বলুন…
তৌফিক এম. সেরাজ: শেল্টেক ৩০ পেরিয়ে সামনে ৩১ বছরে পা রাখছে। আমাদের দেশের আবাসন খাতের প্রেক্ষাপটে একটি কোম্পানি তিন দশক ধরে টিকে থাকা অনেক বড় চ্যালেঞ্জের। দূরদর্শী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গবেষণা ও প্রতিশ্রুতিশীল এক ঝাঁক উদ্যমী কর্মীর কারণে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে টিকে আছি। এ খাতে উত্থান-পতনের মধ্যেও আমরা এগিয়েছি। এক্ষেত্রে গুণগত মান ধরে রাখা, সঠিক সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর ও বিক্রয়োত্তর সেবা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এখন শুধু আবাসন নয়, আরও কয়েকটি সেক্টরে কাজ করছি। নতুন সেক্টরেও শেল্টেক তার সাফল্যের ছাপ রাখছে। চলমান সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখে মানুষের আস্থা ধরে রাখতে আমরা কাজ করছি।

সর্বশেষ..