প্রতিদ্বন্দ্বীরাই ‘নগদ’-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে

তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের সুবিধা দিতে ‘নগদ’ নামে ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস চালু করেছে ডাক বিভাগ। এ সেবার মাধ্যমে যে কেউ কম খরচে দ্রুত ও নিরাপদে আর্থিক লেনদেন করতে পারবেন। গত সপ্তাহে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল চট্টগ্রামে অফিসিয়াল এক সফরে যাওয়া ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুশান্ত কুমার মণ্ডল নগদের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা, বাজার প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুল আলম

শেয়ার বিজ: আপনার নেতৃত্বে চালু হওয়া ‘নগদ’ সম্পর্কে কিছু বলুন।
সুশান্ত কুমার মণ্ডল: কয়েক বছর আগেও প্রযুক্তির পাল্লায় পিছিয়ে ছিল ডাক বিভাগ। তবে ডাক বিভাগের বিস্তৃত অবকাঠামোর সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিশনকে এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ অনুভূত হচ্ছিল। সেই আলোচনা ও অভিজ্ঞতার ফসল আজকের ‘নগদ’, যা অন্যান্য ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মতো একটি সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। গত ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সম্প্রসারিত এ আর্থিক সেবাটি উদ্বোধন করেন। এ সেবাটি বিভিন্ন ডিজিটাল চ্যানেল যেমন অ্যাপ, মোবাইল ফোন, এটিএম, পিওএস টার্মিনাল, এনএফসি-এনাবেল্ড ডিভাইস, চিপ, ইলেকট্রনিক এনাবেল্ড কার্ড, বায়োমেট্রিক ডিভাইস, ট্যাবলেটসহ অন্যান্য সব ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে সক্ষম, যা দ্রুত সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠবে। এর মধ্যে এক লাখ ৩০ হাজার এজেন্ট নিয়োগ হয়ে গেছে। প্রায় সাত লাখ হিসাব চালু হয়েছে।
শেয়ার বিজ: বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদের অনুমোদন নিয়ে জনমনের বিভ্রান্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
সুশান্ত কুমার মণ্ডল: ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) পরিচালনার অনুমোদন দেয়। এসব এমএফএসের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ডাক বিভাগ পরিচালিত হয় নিজস্ব আইনের (পোস্টাল অ্যাক্ট) আওতায়। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারে না থাকায় তারা এই সেবাটিকে অনুমোদন দেয়নি। পরে আমরা নিজেরাই এই সেবা চালুর জন্য অগ্রসর হয়েছি। ডাক বিভাগ অনেক আগে থেকেই ব্যাংকের মতো করে কিছু সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি এই সেবার আওতায় টাকা পাঠানো হয়, যেটা এখন ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিসে রূপান্তরিত হয়েছে। তাছাড়া পোস্টাল ক্যাশ কার্ডও রয়েছে, যা ব্যাংকের কার্ডের মতোই একটি সেবা। এ নিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান অপ্রপ্রচার চালাচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই।

শেয়ার বিজ: নগদের লোগো নিয়ে জটিলতা আছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

সুশান্ত কুমার মণ্ডল: লোগো নিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা নেই। আর লোগো তো একটি প্রতীকী বিষয়। এখানে কারও পা আছে তো হাত নেই। আবার কারও হাত আছে, পা নেই ইত্যাদি হতে পারে। কিন্তু নগদ শব্দটি লেখায় বর্ণের মাত্রা নিয়ে সমস্যা আছে। এটি শুদ্ধ বাংলায় লেখার জন্য মন্ত্রী মহোদয় নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি আমাদের ফেস্টুনে দেখবেন, নগদ লেখায় পরিবর্তন এসেছে।

শেয়ার বিজ: নগদ-এ ডাক বিভাগের বিনিয়োগ ও মালিকানা সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।

সুশান্ত কুমার মণ্ডল: ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এ ডাক বিভাগের ৫১ শতাংশ মালিকানা আছে। বাকি ৪৯ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়েভ টেকনোলজির। যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এই নতুন আর্থিক সেবা পরিচালনা হচ্ছে। তবে এজন্য ডাক বিভাগের আলাদা কোনো বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়নি। আমাদের বিদ্যমান অবকাঠামো ও দেশের প্রতিটি পোস্ট অফিস ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ সেবার আওতায় থাকবে। এজন্য আলাদা করে ব্র্যান্ডিং এবং প্রযুক্তি স্থাপনের কাজ চলছে।

শেয়ার বিজ: ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এর চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?

সুশান্ত কুমার মণ্ডল: আমরা যেহেতু বাজারে নতুন। এক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ আছে। বর্তমানে বিকাশ, রকেট বা অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মতো আমাদের ‘নগদ’। এসব কোম্পানি শুরু থেকেই আমাদের সার্ভিসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় আমাদের ফেস্টুন, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলাসহ ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। তাদের সব অভিযোগ ভুয়া ছিল, যা সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত করে আমাদের পক্ষে রিপোর্ট দেয়। আসলে নগদ যতদিন থাকবে, তখন এসব চ্যালেজ্ঞগুলো থাকবে। তবে আশার কথা হলো, আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ১০ হাজার পোস্ট অফিস ও ৪০ হাজার কর্মকর্তা নিয়ে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে এদেশের মানুষের দোরগোড়ায় সেবা দিয়ে আসছে। আগে থেকেই পোস্টাল ক্যাশ কার্ড এবং ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সিস্টেম চালু আছে। বর্তমানে চালু হলো ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ। এ সেবাকে জনপ্রিয় করার জন্য রেড ক্রস, উত্তরাঞ্চল রেলের সঙ্গে পেনশন বা ভাতা বিতরণ চুক্তি করেছি। আমাদের গ্রাহক ১৭ কোটি মানুষ। আমরা এমনভাবে সার্ভিস দিতে চাই যেন জনগণ উপকৃত হয়। প্রয়োজন হলে আমরা বিনামূল্যে সেবা দেব। আমরা সরকারকে আয় করে দেওয়ার জন্য সঞ্চয়পত্র, সঞ্চয় ব্যাংক, ডাক জীবন বিমা, মানি অর্ডার, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিসসহ (ইএমটিএস) একাধিক লাভজনক খাত আছে।

শেয়ার বিজ: ‘নগদ’-এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কেমন দেখছেন।

সুশান্ত কুমার মণ্ডল: ডাক বিভাগে মানি অর্ডারে দৈনিক চার কোটি টাকা লেনদেন হলেও এখন মোবাইল মানি অর্ডার আসায় ১৪ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ লেনদেন বাড়বে। তার মানে এই নয়, আমরা বিকাশ বা অন্যান্য কোম্পানির ব্যবসা কমিয়ে বা বসিয়ে দিয়েছি। তাদের ব্যবসায়িক কৌশল দিয়ে তারা এগিয়ে যাবে। আমাদের কৌশল দিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। এর মধ্যে আমাদের এজেন্ট কমিশন অন্যান্যদের তুলনায় বেশি দিচ্ছি। যেখানে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এক দশমিক ৮৫ শতাংশ কমিশন দিচ্ছে, সেখানে আমাদের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রয়োজনে কমিশন আরও কমানো হবে। কারণ আমাদের দৈনিক লেনদেনের টার্গেট ১০০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে আমরা কারও প্রতিযোগী নয়। আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, ৬৬ শতাংশ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আর্থিক মূলধারার সঙ্গে যুক্ত নয়। তাদের যুক্ত করার লক্ষ্যে ‘নগদ’ কাজ করবে। পাশাপাশি সরকারি অনেক প্রকল্প আছে, সেগুলোকে আমরা অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা করছি। এছাড়া একটি মোবাইল সংযোগের বিপরীতে একটি এমএফএসে একটির বেশি অ্যাকাউন্ট খোলা যায় না। কিন্তু ডাক বিভাগের এই সেবায় একটি মোবাইল ফোন সংযোগের বিপরীতে পাঁচটি অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে। এতে মোট ৫০ হাজার করে মোট আড়াই লাখ টাকা লেনদেন করা যাবে, যা আমাদের সার্ভিসকে আরও জনপ্রিয় গ্রহণযোগ্য করবে। তবে অর্থ পাচার কিংবা অবৈধ লেনদেনের সুযোগ থাকবে না।