‘প্রতিষ্ঠানের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে ম্যানেজমেন্টকে সঠিক তথ্য দেন ফাইন্যান্স কর্মকর্তা’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার দি সিটি ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. মাহবুবুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. মাহবুবুর রহমান দি সিটি ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা সিটি কলেজ থেকে বিকম শেষে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি (সিএ) পেশাগত ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সম্মানিত ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

মো. মাহবুবুর রহমান: ক্যারিয়ার শুরু করি হাওলাদার ইউনুস অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্মে ট্রেইনি হিসেবে। পরে সিএ পাস করে ১৯৯৯ সালে র‌্যাংগস ইলেকট্রনিক্সে যোগ দিই অ্যাকাউন্টস কন্ট্রোলার হিসেবে। ২০০০ সালে গ্রামীণফোনে ফাইন্যান্স ম্যানেজার হিসেবে কাজ করি। পদোন্নতি পেয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে অ্যাডিশনাল জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর লিড্্স করপোরেশনে সিএফও হিসেবে যোগ দিই। ২০১১ সালে সিটি ব্যাংকের সিএফও হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিলেন?

মাহবুবুর রহমান: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হবÑএমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম। তখন বুককিপিং নামে একটা বিষয় ছিল। সেটি পড়তে বেশ ভালো লাগত। পরীক্ষায় ভালো নম্বরও পেতাম। তাই উচ্চমাধ্যমিকে বাণিজ্য বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত নিই। তখন সিনিয়ররা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে লক্ষ্য নিয়ে পড়ালেখা করতে থাকি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়। ভর্তি হয়ে কিছুদিন পর ঢাকা সিটি কলেজে বিকম পড়ার সিদ্ধান্ত নিই। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করে সিএ পড়তে অনেক সময় লাগবে কিন্তু সিটি কলেজ থেকে কম সময়ে বিকম শেষ করা যাবে। বিকম শেষে সিএ’তে ভর্তি হই। সিএ পড়তে বা সফল হওয়ার ইচ্ছা আমার মধ্যে ভীষণভাবে কাজ করতে থাকে। শুরু থেকেই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে পড়ালেখা করি। আমার মধ্যে সিরিয়াসনেস আসে। পড়ালেখা করতে থাকি এবং সিএ পাস করি। এটাই আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এরপর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করি। ফাইন্যান্স পেশার চ্যালেঞ্জ ও প্রতিষ্ঠানে সরাসরি ভূমিকা রাখার বিষয়টিকে ভালো লাগাতেই ফাইন্যান্সকে পেশা হিসেবে বেছে নিই।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে দক্ষ অর্থ কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

মাহবুবুর রহমান: অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সিএফও। এর মধ্যে অন্যতম প্রতিষ্ঠানের দিকনির্দেশনা দেওয়া। প্রতিষ্ঠানের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য ম্যানেজমেন্টকে দেওয়া। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানে অনেক লিগ্যাল কমপ্লায়েন্স ইস্যু আছে, যা প্রতিনিয়ত সিএফওকে দেখভাল করতে হয়। ট্যাক্সেশন ম্যানেজমেন্ট ও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার জন্য পরিকল্পনা করাও তার দায়িত্ব। যেহেতু একজন সিএফও প্রতিষ্ঠানের ডেটা ও ধারা সম্পর্কে অবহিত থাকেন, তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

 শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) প্রতিষ্ঠানের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

মাহবুবুর রহমান: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ের স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য আইনটি করা হয়েছে। এটা ভালো উদ্যোগ। তবে এর মান নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। আমি মনে করি, এ আইনের সুফল তখন ভোগ করা যাবে, যখন রিপোর্টিংয়ে স্বচ্ছতা আসবে। মার্কেটে এর সচেতনতা বাড়বে, সবাই এর সুফল সম্পর্কে জানবে এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন হবে। আরেকটি বিষয় বলতে চাই, কেবল সিএফও ও অডিটররাই এ বিষয়ে অবগত থাকলে হবে না। অন্যদের দায়িত্বও বাড়াতে হবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের করনীতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মাহবুবুর রহমান: আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে দেশের করনীতিতে অনেক পরিবর্তন আনা দরকার বলে মনে করি। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার অনেক কম। বিনিয়োগের জন্য দেশের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য তাদের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান আনতে হবে। বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠান আনার সামর্থ্য বা ইচ্ছা থাকলেও সে ধরনের উদ্যোগ উদ্যোক্তারা নেন না। কারণ কোনো সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান তার ইনকামের ওপর কর ও মুনাফা ঘোষণা দেওয়ার পর প্যারেন্ট কোম্পানি মুনাফা পেলে তার ওপর আবার কর দিতে হয়। এটা মোটেও ব্যবসাবান্ধব নয়। এই যে করের ওপর কর, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত। তাছাড়া করহার কমিয়ে কর এলাকা বাড়ানো উচিত বলে মনে করি। কর প্রদানকারীদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা কর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাতে অর্থ কর্মকর্তার চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

মাহবুবুর রহমান: প্রধান অর্থ কর্মকর্তার সব কাজের মধ্যেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে ব্যাংক খাতের কোম্পানিগুলো বিশেষ কিছু নিয়মনীতি অনুসরণ করে চলে। ব্যাংকের সব ধাপ মনিটর করার জন্য বিশেষ নিয়ম মেনে চলা হয়। কোম্পানি আইন ও সিকিউরিটিজ আইনের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা আইন মেনে চলতে হয়। প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও ব্যাংক খাতের নিজস্ব আইন-কানুনের সঙ্গে ফাইন্যান্সিয়াল বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স কমপ্লাই করে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদিও তা ইতিবাচক চ্যালেঞ্জ। আরেকটি বিষয় হলো, বাংলাদেশে ব্যাংক সেক্টরে সিএফও পদটি বেশিদিনের নয়। ব্যাংকে এখন ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম ডেভেলপ করা শুরু করেছে। বাইরের দেশের ব্যাংকের তুলনায় অনেক প্রতিষ্ঠানে অটোমেশনের অনেক ঘাটতি রয়েছে। বাইরের দেশে রিপোর্টিং ও ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট নিয়ন্ত্রণের জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়, তা এখানে হয় না। এটা একটা চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে প্রধান অর্থ কর্মকর্তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মাহবুবুর রহমান: যে কোনো প্রতিষ্ঠানে সিএফও পদটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এটি চ্যালেঞ্জিংও বটে। প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ সিএফও। এ পেশায় থেকে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরাসরি কাজ করা যায়।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে সফল হতে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?

মাহবুবুর রহমান: যারা এ পেশায় আসতে চান, তাদের সাহসী হতে হবে। তাদের মধ্যে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি। ইচ্ছাশক্তিই পারে যে কোনো মানুষকে সফলতার শিখরে নিয়ে যেতে। সফলতার কোনো শর্টকাট পথ নেই। সব বিষয় জেনে-বুঝে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হবে।

সফল ফাইন্যান্স পেশাজীবী হতে হলে ফাইন্যান্সের প্রতিটি কনসেপ্ট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। বিজনেস প্ল্যানিং, স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। অর্থায়ন বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হয়, ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে ভালো বোঝাপড়া থাকতে হবে। প্ল্যানিং ও আর্থিক লেনদেনের সর্বশেষ প্রভাব কেমন হবে তা জানতে হবে, অ্যাকাউন্টিং জানতে হবে। এটা ভালো না জানলে প্রসেস মনিটর ঠিকভাবে করা যায় না। করপোরেট আইন ও ট্যাক্সেশনের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় ফাইন্যান্স কর্মকর্তাকে দক্ষ হতে হয়। সফলতার জন্য পেশাগত ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রয়োজনীয় লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া ও শেখার আগ্রহ থাকা বাধ্যতামূলক। পরিশ্রম, দক্ষতা ও জ্ঞান আপনাকে এগিয়ে  নেবে।