‘প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সাফল্য। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার বাংলাদেশ সোসাইটি ফর অ্যাপারেল এইচআর প্রফেশনালসের (বিশার্প) সভাপতি ও লন্ড্রি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (এনভয় গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান) হেড অব ফ্যাক্টরি অধ্যাপক নূরে এ. খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

অধ্যাপক নূরে এ. খান বাংলাদেশ সোসাইটি ফর অ্যাপারেল এইচআর প্রফেশনালসের (বিশার্প) সভাপতি ও লন্ড্রি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (এনভয় গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান) হেড অব ফ্যাক্টরি ও একজন এইচআর প্রফেশনালস। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে এমবিএ শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। এক যুগের বেশি সময় ধরে দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন তিনি

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

অধ্যাপক নূরে এ. খান: আমার জন্মস্থান বিক্রমপুরে। এখানেই প্রাথমিক শিক্ষার সমাপ্তি হয়। আর মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন কাটে নারায়ণগঞ্জে। এরপর ঢাকা সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ শুরু করলেও শেষ হয় ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে। পরে ইউনাইটেড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করি। মূলত ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে সহকারী শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু। এরপর আমার একজন শিক্ষক করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরির পরামর্শ দেন। শিক্ষকতা আমার প্যাসন হওয়ায় এ পেশাকে পার্টটাইম ফ্যাকাল্টি হিসেবে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পরামর্শ দেন। পরে বাংলালিংকে যোগ দিই। একটা সময় ধরাবাঁধা কাজ করতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে যাই। চাকরি ছেড়ে সিটি ব্যাংকে চলে আসি; কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। তারপর বৈশাখী টেলিভিশনে মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগে কাজ শুরু করি। মানুষ নিয়ে কাজ করার বিষয়টি আমি উপভোগ করি। বলে রাখা ভালো, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন প্রফেসর নিখিল স্যারের পরামর্শে একটি টিম গঠন করে বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টরের নানা সমস্যা নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করি। তখন থেকেই এ সেক্টরে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়। যেহেতু গার্মেন্ট সেক্টরে কাজ করার ইচ্ছা ছিল, তাই বেশ কয়েক বছর চেষ্টার পর শান্তা গ্রুপে যোগ দিই। ওই প্রতিষ্ঠান থেকেই মূলত গার্মেন্ট সেক্টরের এইচআর নিয়ে আমার কাজ শুরু। শান্তা গ্রুপের পর স্কয়ার গ্রুপ ও সোনিয়া গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এইচআর বিভাগের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর এনভয় গ্রুপের লন্ড্রি ইন্ডাস্ট্রিজে যোগ দিই এবং পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে এর হেড অব ফ্যাক্টরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: কর্মজীবনে এ সফলতার পেছনে আপনার উল্লেখযোগ্য বিষয় কী?

নূরে এ. খান: আমি কোনো কাজকে ছোট মনে করি না। যে লেভেলের কাজই হোক না কেন, তা করতে লজ্জা পাই না। আর কোনো বিষয়ে নিজের সঙ্গে অঙ্গীকার করলে সেটা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়ি না। এছাড়া আমি পরিশ্রম করতে ভালোবাসি। সব সময়ে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করি। তাছাড়া যে কোনো কাজের ব্যতিক্রম পন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। ভালো কিছু সব সময় ভালো লাগে।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ এইচআরের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু বলুন…

নূরে এ. খান: সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ চায় লাভবান হতে ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে। প্রতিষ্ঠানের সফলতার পেছনে অন্যতম ভূমিকা রাখে এইচআর বিভাগ। লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এ বিভাগ ব্যবসার সফলতার অন্যতম নিয়ামক যোগ্য কর্মীবাহিনী নিয়ে কাজ করে। ব্যবসার যাবতীয় বিষয় জানা ও বোঝার পর কাজের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে যোগ্য কর্মী নির্বাচন করে নিয়োগ দেওয়ায় ভূমিকা রাখে এইচআর বিভাগ। একই সঙ্গে কর্মীদের নির্ধারিত লক্ষ্যের সঙ্গে শ্রেণিবদ্ধ করে, প্রশিক্ষণ দিয়ে, প্রেষণা দিয়ে ও কাজের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখে।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে এইচআর ম্যানেজারের জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

নূরে এ. খান: অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এইচআর ম্যানেজারকে পছন্দ নাও করতে পারেন। এইচআর বিভাগ যেহেতু অন্য সব বিভাগের সঙ্গে কাজ করে, তাই প্রতিষ্ঠানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এইচআর ম্যানেজারের কাজকে অনেকে ভালোভাবে নিতে চান না। অর্থাৎ সবাইকে এইচআর বিভাগের কাজের বিষয়ে যথাযথভাবে অবগত করার মাঝে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এইচআর ম্যানেজারদের ‘ওনারশিপ’ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অন্যদের সঙ্গে শেয়ারও করা যেতে পারে এবং ভালো টিম মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশে এইচআর প্র্যাকটিস সম্পর্কে বলুন…

নূরে এ. খান: গার্মেন্ট সেক্টরে এইচআর প্র্যাকটিস অনেক ভালো হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো কমপ্লায়েন্স বিষয়ে যেমন সজাগ, তেমনি এইচআরের যথাযথ প্র্যাকটিসও শুরু হয়েছে। এখানে কালচারেরও পরিবর্তন হচ্ছে। হ্যাঁ, কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে সঠিক চর্চা না হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের চিত্র ভালো। তবে উন্নত দেশের এইচআর প্র্যাকটিস কাঠামোবদ্ধ। আমাদের তুলনায় তারা অনেক এগিয়ে। আমরাও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে এইচআর ম্যানেজারকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

নূরে এ. খান: এটি একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। অবশ্য আমি এইচআরকে কেবল পেশা হিসেবে নয় বরং ব্যবসার অংশ বলতে চাই। এখানে ব্যবসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। ব্যবসার কৌশলগত অংশীদার হতে হবে, লাভ-লোকসান বুঝতে হবে। নিজেকে প্রতিষ্ঠানের মালিক মনে করতে হবে। সব কর্মীকে একই ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

শেয়ার বিজ: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন…

নূরে এ. খান: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের স্বাগত জানাই। আমি মনে করি, এ পেশায় আসার জন্য বিশেষ কিছু গুণ থাকা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে হাসিমাখা মুখ, সুন্দর আচার-ব্যবহার, ভালো স্বভাব, মেধা, মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা ও সুন্দর করে কথা বলার মতো কিছু গুণ।

শেয়ার বিজ: সফল এইচআর পেশাজীবী হতে চাইলে আপনার পরামর্শ…

নূরে এ. খান: স্মার্ট হতে হবে। স্মার্ট বলতে কেবল বেশভূষায় নয়, আপনাকে যখন যেমন পরিবেশ-পরিস্থিতি আসবে, তখন সেভাবে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ায় দক্ষ হতে হবে। একেক প্রতিষ্ঠানে ব্যবসার প্রকৃতি ভিন্ন। তাই যখন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, সে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও মার্কেট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। এমপ্লয়ি এনগেজমেন্টের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। কর্মীদের সব সময় লার্নিং প্রসেসের মধ্যে রাখতে হবে। প্রযুক্তিগত কিংবা অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে, আপডেট থাকতে হবে। ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে হবে।

শেয়ার বিজ: আপনি এখানে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকতা করছেন। কবি, লেখক হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে। সামাজিক কর্মকাণ্ডসহ ব্যবসাও করছেন। এত সময় কীভাবে বণ্টন করেন?

নূরে এ. খান: দেখুন, মানুষ তার নিজের কাছেই নিজে সীমাবদ্ধ। সবকিছুই নির্ভর করছে প্রায়োরিটি ও গুরুত্বের ওপর। আমি ছোটবেলা থেকেই এক সঙ্গে অনেক বিষয়ে নিজেকে জড়িয়েছি। সংগীত ভালোবাসি, কবিতা লিখতে ও আবৃত্তি করতে পছন্দ করি। কলাম লিখতে ভালো লাগে, আর অ্যাকটিভ মানুষ হিসেবে নিজেকে দেখতে হলে সামাজিক কাজের বিকল্প কিছু নেই। শিক্ষকতা আমার ধ্যান-জ্ঞান। যেহেতু আমি ঢাকা তথা বিক্রমপুরের ছেলে, তাই ব্যবসা আমার রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। তাই প্রায়োরিটি ও গুরুত্ব দিয়ে সময়কে ভাগ করে পুরোপুরি কাজে লাগাই।