‘প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে এইচআর বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সাফল্য। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান (ব্যবস্থাপক, মানবসম্পদ) মো. মশিউর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. মশিউর রহমান জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান (ব্যবস্থাপক, মানবসম্পদ)। ভারতের বেঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে তিনি বিবিএম সম্পন্ন করেন এবং সর্বোচ্চ স্কোর ও স্কলারশিপ নিয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে এইচআরএমে এমবিএ সম্পন্ন করেন। তিনি আইপিএমবিএসএইচআরএমের একজন সহযোগী সদস্য

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই।

মো. মশিউর রহমান: ক্যারিয়ার শুরু করি ২০০৩ সালে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির বিপণন, বিক্রয় ও গ্রাহক সেবক হিসেবে। ২০০৫ সালে বেক্সিমকো ফার্মায় মানবসম্পদ নির্বাহী হিসেবে যোগ দিই। সাত বছর দায়িত্বপালনের পর ২০১২ সালে নিপ্রো জেএমআই কোম্পানিতে মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করি। কয়েক বছর ওই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপালনের পর আরকে গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিই। বর্তমানে জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান (ম্যানেজার, হিউম্যান রিসোর্সেস) হিসেবে কাজ করছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে এইচআর’কে কেন বেছে নিলেন?

মশিউর রহমান: প্রথমে এইচআরে চাকরি না পাওয়ায় বিপণন, বিক্রয় ও গ্রাহক সেবক হিসেবে কাজ করি। ব্যক্তিগত জীবনে আমি প্রচণ্ড মিশুক প্রকৃতির একজন মানুষ। আর কর্মের তাগিদে অনেক মানুষের সঙ্গে মিশতে হতো। মূলত তখন থেকে ভালোলাগা এবং পেশাগত কারণে আমি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশছি। ওই সময়ে ভাবনাটা আসে যে, সরাসরি মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গেলে এইচআরের বিকল্প নেই। তাই একে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ এইচআরের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন।

মশিউর রহমান: মানুষ বা কর্মী ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সুতরাং এই কর্মীদের প্রথমে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুসারে সাজাতে এইচআর টিমের প্রয়োজন। এই টিমের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মীদের দক্ষতা, সক্ষমতা প্রভৃতি যাচাই করে চাকরির সুযোগ দিতে সাহায্য করে, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে। সুশৃঙ্খল ও প্রশিক্ষিত লোকবল কোম্পানির মুনাফায় বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে। তাছাড়া প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, মোটিভেশন, কাউন্সেলিং, সাকসেশন প্ল্যানিং, চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট, রিটেনশন প্ল্যানিং, এমপ্লয়ি এনগেজমেন্ট, মিশন, ভিশন প্রভৃতিকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে এইচআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে এইচআর মানেজারকে কোন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়?

মশিউর রহমান: প্রথমত যে মানুষটিকে যোগ্য হিসেবে নিচ্ছি তিনি তার কাজের মধ্যে যোগ্যতার ছাপ রাখছেন কি না, এটা পর্যবেক্ষণের বিষয়। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের যোগ্য লোকবল যদি চলে যায় তার প্রকৃত কারণগুলো বোঝা ও যোগ্য কর্মীদের ধরে রাখা। তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বোঝা এবং ম্যানেজমেন্টের পরিচালনা বুঝে প্রতিষ্ঠানের লোকবলগুলোকে দুই দিকে (মালিক ও শ্রমিক) ভারসাম্য বজায় রেখে সাজানো এবং তদনুযায়ী ব্যবসায়িক নীতি মেনে কর্মীদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এসব কাজের মধ্যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এই চ্যালেঞ্জকে আমি উপভোগ করি।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের এইচআর প্র্যাকটিস সম্পর্কে বলুন।

মশিউর রহমান: প্রতিষ্ঠানে কর্মী আসবে-যাবে এ সংস্কৃতিকে অনেকেই স্বাভাবিক মনে করেন। এটা ঠিক নয়, যোগ্য কর্মীকে যাচাই করে যেমন নিয়োগ দেওয়া জরুরি, ঠিক তেমনি তাকে ধরে রাখা প্রয়োজন। এর পেছনে রয়েছে ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, এমপ্লয়ি এনগেজমেন্ট, মোটিভেশন, কাউন্সেলিং, পুরস্কার প্রভৃতি। আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান এ বিষয়গুলোতে পিছিয়ে আছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো মানবসম্পদের চর্চায় আমাদের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে। আমাদের দেশে তেমনটি দেখা যাচ্ছে না। এখানে পেশাটি সম্ভাবনাময়। অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসছে। আশা করি, শিগগিরই এখানে এ বিভাগের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।

শেয়ার বিজ: এইচআরকে পেশা হিসেবে আরও গ্রহণযোগ্য করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

মশিউর রহমান: একজন দক্ষ কর্মীকে কোন কোন জায়গায় কাজে লাগানো যায়, তার কোন কাজ থেকে সর্বাধিক ফল পাওয়া যায় এসব প্রশ্ন যখন কর্তৃপক্ষের মাথায় ঘুরপাক খাবে, কিংবা বিষয়গুলো যখন প্রতিষ্ঠানের মালিকের দৃষ্টিগোচর হবে, বোধগম্য হবে এবং পাশাপাশি এ ধরনের কাজ পরিচালনার দায়িত্ব যখন একজন মানবসম্পদ কর্মকর্তার ওপর বর্তাবে, তখনই এ বিভাগের গুরুত্ব বাড়বে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগের চাহিদা বাড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ বিষয়ে উদ্যোগী হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সাধারণ শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি এইচআর-সম্পর্কিত ডিপ্লোমা ও শর্ট কোর্স চালু করা উচিত। তাহলে এই পেশায় অনেকে আগ্রহী হবে।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে এইচআর ম্যানেজারের কাজকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মশিউর রহমান: অবশ্যই এটি সম্মানের ও চ্যালেঞ্জিং পেশা। চ্যালেঞ্জকে উপভোগ করার মতো সুযোগও রয়েছে। বর্তমানে এইচআর কোম্পানির কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। সব ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে কাজ করা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থাকায় কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদটা অদূর ভবিষ্যতে অন্য বিভাগের মতো এইচআর প্রধানদের দখলে থাকবে বলে আমি মনে করি।

শেয়ার বিজ: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ…

মশিউর রহমান: উচ্চাশা থাকা ভালো। সব বাধা পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে হবে। উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি, পেশাগত জ্ঞান ও ধৈর্যই উচ্চশিখরে নিতে পারে একজন এইচআরকর্মীকে। সাধারণত আমরা জানি বিক্রয়, বিপণন ও হিসাব বিভাগ থেকে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী হয়। কিন্তু এইচআর যেহেতু কোম্পানির কৌশলগত অংশীদার, সেজন্য এ পদটাতে পৌঁছানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সুতরাং আমি মনে করি একাডেমিক রেজাল্ট অত্যন্ত সাউন্ড থাকা বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী সমসাময়িক যেসব এইচআর-বিষয়ক পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, সেগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখা বা জানা ও অনুশীলন করা হলে উদ্দেশ্যটাকে সফল করা সম্ভব।