‘প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের সম্পদের সুরক্ষা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সিএফও’র দায়িত্ব’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সাফল্য। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়।খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. কেরামত আলী, এসিএমএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. কেরামত আলী, এসিএমএ, ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরে সম্পন্ন করেন কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্সি পেশাগত ডিগ্রি। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) একজন সহযোগী সদস্য।

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…
মো. কেরামত আলী, এসিএমএ: চাকরিজীবন শুরু করি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের অর্থ ও মানবসম্পদ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে, ২০০৯ সালে। ওই প্রতিষ্ঠানে সাত বছর ব্যবস্থাপক ও জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হিসেবে অর্থ ও হিসাব বিভাগ, মানবসম্পদ বিভাগ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও রেগুলেটরি রিপোর্টিং বিভাগে কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করি। ২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেডে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে যোগদান করি এবং অদ্যাবধি সাফল্যের সঙ্গে সবার সহযোগিতা নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।

শেয়ার বিজ: পেশাগত ডিগ্রি কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্সিকে কেন বেছে নিলেন?
কেরামত আলী: বাংলাদেশে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি সম্মানজনক পেশা কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিং। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করি এবং এমবিএ ফাইনাল রেজাল্ট প্রকাশ হওয়ার আগেই চাকরিতে যোগ দিই। চাকরিরত অবস্থায় পেশাদার অ্যাকাউন্টিং ডিগ্রি অর্জনের জন্য সিএমএ ছাড়া বিকল্প না থাকায় আইসিএমএবিতে ভর্তি হই ২০১২ সালের ডিসেম্বর সেশনে। ২০১৫ সালের আগস্টে সাফল্যের সঙ্গে সিএমএ ডিগ্রি সম্পন্ন করি। সিএমএতে অধ্যয়নরত অবস্থায় লব্ধ জ্ঞান ও বাস্তব ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি আর সেটি হচ্ছে, একটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, সামর্থ্য, দুর্বলতা ও সম্ভাবনা সঠিকভাবে চিহ্নিত করে যথাযথ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর উন্নয়ন ঘটাতে ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টদের বিকল্প নেই। একটি সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে যথাসময়ে সঠিক ব্যয়ে সঠিক কাজটি করা। আর এটি নিশ্চিত করতে পারেন কেবল ব্যবস্থাপনা হিসাববিদ। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা যায় বলেই সিএমএ ডিগ্রি অর্জনে আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে একজন সিএফও’র গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন…
কেরামত আলী: প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদের প্রধান কাস্টডিয়ান (রক্ষক)। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের সম্পদের সুরক্ষা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করাই তার কাজ। প্রতিষ্ঠানের সব লেনদেনে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে কি না, তা দেখাও তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে কোন লেনদেন আইনের ভেতরে থেকে কীভাবে সম্পন্ন করলে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধি পাবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন তিনি। সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতা পরিপালনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের টেকসই উন্নয়ন অর্জনে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী কার্য সম্পাদনে নেতৃত্ব দেওয়া একজন দক্ষ সিএফও’র কাজ।

শেয়ার বিজ: তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে দায়িত্ব পালনে সিএফওকে কোন বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বসহ দেখতে হয়?
কেরামত আলী: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের অর্থ নিয়ে ব্যবসা করে। তাই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। এসব দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তাকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হয়। সিএফও’র প্রস্তুতকৃত আর্থিক বিবরণীর ওপর ভিত্তি করে সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ওই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। তাই সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ যেন সুরক্ষিত থাকে এবং সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হয় সেটি নিশ্চিতের দায়িত্ব সিএফও’র। কোম্পানির সব কার্যক্রম দেশের প্রচলিত প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করা, কার্যক্রমের সঠিক তথ্য স্বচ্ছতার সঙ্গে উপস্থাপন করা ও সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীর সম্পদ সুরক্ষা সিএফও’র দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম।

শেয়ার বিজ: দায়িত্ব পালনে সিএফওকে কোন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়?
কেরামত আলী: সিএফওকে চৌকস হতে হবে। দ্রুততম সময়ে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সঠিক পরামর্শ দেওয়াটা তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন আইন পরিপালন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্ভুলভাবে একাধিক প্রতিবেদন প্রস্তুত ও দাখিল, প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মিশ্রণ ঘটানো প্রভৃতিও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে। করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কার্যক্রম আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা; সর্বোপরি নিজস্ব শ্রমের সঙ্গে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের আপস করে কাজ করে যাওয়াটা একজন সিএফও’র জন্য চ্যালেঞ্জের।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোয় করপোরেট গভর্ন্যান্স সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
কেরামত আলী: বাংলাদেশে ২০১২ সালের পর থেকে করপোরেট গভর্ন্যান্স সম্পর্কে এ জগতের মানুষের মধ্যে সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। উদ্যোক্তারা ব্যবসাকে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা না করে সমাজসেবার মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করছেন। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বিভিন্ন আইন ও নির্দেশনা প্রণয়নের মাধ্যমে। তবে আমি যেটা বুঝি, তা হলো ‘আপনি ভালো তো জগত ভালো’; অর্থাৎ মানুষ যদি নিজে থেকে ভালো না হতে চায়, তাহলে আইন প্রয়োগ করেও তাকে ভালো করা যায় না; নিয়ন্ত্রণ করা যায় মাত্র। চিহ্নিত অনিয়মের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হলে করপোরেট সুশাসন বাস্তবায়নে মানুষ আগ্রহের পাশাপাশি নিয়ম মেনে চলতে বাধ্যও হবে। অপরদিকে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যদি প্রতি বছর সেরা করপোরেট গভর্ন্যান্স কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তবে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ বাড়বে।

শেয়ার বিজ: সিএফও পেশাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
কেরামত আলী: একজন সিএফও’র কাছে প্রতিষ্ঠানে সম্পদ ও তথ্য আমানত থাকে, যার যথাযথ হেফাজত করা তার নৈতিক দায়িত্ব। এটি সামাজিকভাবে একটি সম্মানজনক পেশা। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনও সিএফওকে নিছক একজন কেরানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা দুঃখজনক। প্রতিষ্ঠানে সিএফওদের গুরুত্ব তুলে ধরতে আইসিএমএ, আইসিএবি, আইসিএসবিসহ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর জোরালো ভূমিকা আগামীতে দেখতে পাব বলে আশা করছি।

শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্স পেশায় কেউ ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন…
কেরামত আলী: ফাইন্যান্স পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে হলে সবার আগে সৎ মানুষ হওয়া জরুরি। অর্থ ও হিসাব বিষয়ে সম্যক জ্ঞানার্জন ও এর বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ জানতে হবে। একই কাজ ভিন্নভাবে সম্পন্ন করে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারা, সর্বোপরি সিনিয়রদের সম্মান ও জুনিয়রদের স্নেহ করার মানসিকতা থাকতে হবে।

শেয়ার বিজ: কর্মজীবনে সফলতার জন্য তরুণদের কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে পরামর্শ দেবেন?
কেরামত আলী: কর্মজীবনে সফলতা অর্জনে সব সময় নতুন বিষয় জানার প্রতি আগ্রহ থাকতে হবে। বর্তমানে কৃত কাজটি আরও কত কম সময়ে অধিক তথ্যবহুল করে করা যায়, তা শিখতে হবে। কোনো নেতিবাচক চিন্তা করা যাবে না। মনে করতে হবে তুমি না পারলে কেউ পারবে না। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও বিনয়ী হতে হবে। সব সময় মা-বাবার দোয়া নিয়ে চলতে হবে।