‘প্রতিষ্ঠানে দক্ষ সিএফওর ভূমিকা সীমাহীন’

 

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. ফরহাদ হোসেন, এফসিএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মো. ফরহাদ হোসেন, এফসিএ সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ-এমবিএ (অ্যাকাউন্টিং) শেষে সম্পন্ন করেছেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পেশাগত ডিগ্রি। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) একজন সম্মানিত ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

মো. ফরহাদ হোসেন: ক্যারিয়ার শুরু করি ওয়ারিদ টেলিকমে ২০০৮ সালে, ইন্টারনাল অডিট বিভাগে। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর রহিমআফরোজ (বাংলাদেশ) লিমিটেডে ইন্টারনাল কন্ট্রোল বিভাগে দুবছর কাজ করি। এরপর আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেডে যোগ দিই। এখানে তিন বছর কাজ করার পর ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডে সাড়ে তিন বছর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর ২০১৭ সালের মার্চ থেকে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিলেন?

ফরহাদ হোসেন: ফাইন্যান্সে আসার বেশকিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো এটি একটি সম্মানজনক পেশা। এছাড়া চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের জন্য ফাইন্যান্স পেশায় ভূমিকা রাখার সুযোগ বেশি। প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজ করেন ফাইন্যান্স কর্মকর্তা। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরা তাদের জ্ঞানের প্রয়োগ করতে পারেন এ বিভাগে কাজ করে। তাছাড়া এ পেশার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে সরাসরি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। এ পেশায় উন্নতি করার সুযোগ আছে। তাছাড়া পেশাটি বেশ আকর্ষণীয়। এ পেশার চ্যালেঞ্জ, মর্যাদা, ভালোলাগা থেকেই ফাইন্যান্স পেশায় কাজ করা।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে একজন প্রধান অর্থ কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই

ফরহাদ হোসেন: প্রতিষ্ঠানে একজন অর্থ কর্মকর্তার গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানের একজন স্বাস্থ্য পরীক্ষক; কারণ তিনি প্রতিষ্ঠানের সব দিক সম্পর্কে অবগত থাকেন। প্রতিষ্ঠানের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য তার কাছে থাকে। সব তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখেন তিনি। তাছাড়া যে কোনো প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের ফাইন্যান্সিয়াল, আইনগত ও রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স পরিপালন করা ফাইন্যান্স কর্মকর্তা বা সিএফওর অন্যতম কাজ। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সিএফওর বড় দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধিতে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে থাকেন তিনি। ফাইন্যান্স প্ল্যানিং, বাজেটিং, কস্ট কন্ট্রোল, নতুন আয়ের খাত সৃষ্টি, ব্যবসায় নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা, নতুন পণ্য ও সেবার কস্ট বেনিফিট পর্যালোচনা এবং এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেন তিনি। এজন্য প্রতিষ্ঠানে একজন দক্ষ সিএফওর ভূমিকা সীমাহীন।

শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) কোম্পানির ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে?

ফরহাদ হোসেন: অনেক সমালোচনার পর এফআরএ পাস হয়েছে। কাউন্সিল গঠন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করি। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ের স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য আইনটি করা হয়েছে। এটা ভালো উদ্যোগ। এফআরএ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে করপোরেট গভর্নেন্স ইস্যুতে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীর জন্য ভালো হবে। কিন্তু সঠিকভাবে বাস্তবায়নটা জরুরি। এ আইনের বাস্তবায়নে সামান্য ত্রুটি থাকলে এফআরএ প্রণয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের করনীতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ফরহাদ হোসেন: করপোরেট করের বিষয়টি নিয়ে আরও চিন্তার সুযোগ রয়েছে। যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপরই করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তারা নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরিবর্তে হয়রানির সম্মুখীন হন। ফলে কর প্রদানকারীরা কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হন। সরকারের উচিত, করহার কমিয়ে করের আওতা ও পরিধি বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আরও সহজ করা। কর কর্তৃপক্ষকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও ইউজার ফ্রেন্ডলি করা সম্ভব হলে করের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। জোরজবরদস্তি না করে মানুষকে কর প্রদানে উৎসাহিত করতে হবে। সরকারকে এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: কোম্পানিতে সিএফওর জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকে?

ফরহাদ হোসেন: সব কাজে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ পেশাও ব্যতিক্রম নয়। সময়ের সঙ্গে আইনকানুন, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসার পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে, যা এ পেশার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফাইন্যান্সিয়াল রিস্ক, বিজনেস রিস্ক অনেক বেড়ে গেছে। এসব রিস্ক নির্ণয় করে এর সমাধানের উপায় বের করাটাও চ্যালেঞ্জের। একজন ফাইন্যান্স কর্মকর্তার অন্যতম বড় দায়িত্ব হচ্ছে, বিভিন্ন কমপ্লায়েন্সকে পরিপালন করা। আর একটি প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্সিয়াল কমপ্লায়েন্সগুলো কমপ্লাই করার পাশাপাশি বর্তমানে অর্থায়ন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ ও পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন এবং শেয়ারহোল্ডারদের সম্পদ বৃদ্ধি নিশ্চিত করাটাও কম চ্যালেঞ্জের নয়।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে সিএফওকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ফরহাদ হোসেন: পেশা হিসেবে অনেক আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। একই সঙ্গে অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানে সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি পেশা। এ পেশায় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা টিমের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। পেশাটির মাধ্যমে অনেক কিছু শেখা ও তার বাস্তবিক প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ

ফরহাদ হোসেন: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের স্বাগত জানাই। এ পেশায় কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ভূমিকা রয়েছে। দিন দিন ব্যবসার পরিধি বাড়ছে, একই সঙ্গে ফাইন্যান্স পিপলের ভূমিকা ও চাহিদা বাড়ছে। তাই যারা এ পেশায় আসতে চান, এ পেশার চ্যালেঞ্জ, ক্ষেত্র ও পরিধি বুঝে সেভাবে আগে থেকেই নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: সফল সিএফও হওয়ার জন্য আপনার পরামর্শ কি?

ফরহাদ হোসেন: প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। সৎ ও ন্যায়পরাণ হতে হবে। ব্যবসা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখতে হবে; বুঝতে হবে। যোগাযোগ দক্ষতায় ভালো হতে হবে। নিজেকে আপডেট রাখার জন্য নিয়মিত পড়ালেখা করতে হবে; পরিশ্রমী হতে হবে। জানার আগ্রহ থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানকে জানতে ও বুঝতে হবে। সর্বোপরি জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সবাইকে প্রভাবিত করার মতো ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে।