দুরে কোথাও

প্রবাসী শিক্ষার্থীদের ঈদভাবনা

বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। তাদের কাছে শোনা যাক প্রবাসে ঈদ আনন্দ ও বেদনার গল্প। জানাচ্ছেন ফায়জুন সিতু

মো. মনির হোসেন
পিএইচডি গবেষক, চোনবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া
দেশের বাইরে এটাই আমার প্রথম ঈদ। এখানে আসার পর থেকে দেশের সবকিছু ভীষণভাবে মিস করছি। এখানকার মানুষজন রমজান, রোজা ও ঈদ সম্পর্কে কিছুই জানে না। রোজা পালনের জন্য আমরা মুসলিমরা সারাদিন আহার থেকে বিরত থাকি বিষয়টি তাদের খুব অবাক করে। কিন্তু ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে, বিষয়টি সম্পর্কে জানানোর পর আমার সুপারভাইজার ও অন্যান্য ল্যাবমেট রোজা পালনে যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্য আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। কোরিয়ানদের মধ্যে মুসলিম খুব একটা না থাকলেও বন্ধের দিনগুলোয় এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলিমরা সবাই একসঙ্গে ইফতার করে থাকেন। দেশের বাইরে থেকে পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ইফতার করাটা খুব মিস করি। পরিবারের সদস্য কেউ এখানে না থাকায় ঈদের দিন হয়তো বাসায় বিশেষ কিছু আয়োজন করা সম্ভব হবে না। তবে আমার মতো যারা পরিবার ছেড়ে এখানে আছেন, তারা সবাই মিলে কিছু খাবারের আয়োজন করার ইচ্ছা আছে। অফিসিয়াল বন্ধ না থাকায় ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোয় ঈদ না হলে ঈদের নামাজের পর সবাই যার যার মতো ক্লাস অথবা ল্যাবে চলে যাবেন। তবে সুযোগ হলে যারা পরিবারসহ এখানে আছেন, তাদের বাসায় বেড়াতে যাব।

ফারজানা হানিফ প্রমা
শিক্ষার্থী, কুকমিন ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া
আমি দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকি, মাস্টার্স করছি বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সে। দেশের বাইরের ঈদ উদ্যাপনের অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, দেশের ঈদের কোনো আমেজ এখানে পাওয়া যায় না। ঈদের দিনও অনেকের এক্সাম, ল্যাবে কাজ কিংবা মিটিং থাকে। তারপরও দেশের বাইরে আমরা এক টুকরো বাংলাদেশ বানাই। সারাদিন ব্যস্ততা থাকলেও দিনশেষে মিলিত হই। একসঙ্গে রান্না করে খাই। হাসি, গান আর আড্ডায় মেতে উঠি। তবুও যখন পরিবারের কথা মনে পড়ে, তখন খুবই বিষন্ন হয়ে পড়ি। বেদনাটুকু নানা উপায়ে ভুলতে চেষ্টা করলেও দুঃখবোধটা বুকের মাঝে গুমরে ওঠে। প্রায়ই মনে হয়, একবার হলেও দেশে চলে যাই। গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরি, ছোটদের সঙ্গে আনন্দে মেতে উঠি।

ডা. মো. শাফায়েত উল্লাহ
জেনারেল সার্জারি (এমএস), কার্স আল আইনি হাসপাতাল, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়, মিসর
দেশের বাইরে প্রবাস জীবনে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো ঈদ করতে যাচ্ছি। ২০১৬ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় বৃত্তি পেয়ে চলে আসি পিরামিডের দেশ মিসরে। সে বছরই ছিল বিদেশে আমার প্রথম ঈদ। পরিবারকে দূরে রেখে প্রবাসীদের ঈদ করার যে বেদনা, তা সে সময় খুব ভালোভাবে উপলদ্ধি করি। প্রবাস জীবনের প্রথম ঈদ খুব একটা ভালো কাটেনি। কারণ, কাউকে ভালোভাবে চিনতাম না। তবে পরবর্তী ঈদগুলো আমরা প্রবাসীরা চেষ্টা করেছি সবাই মিলে একসঙ্গে করার, যাতে পরিবারকে কাছে না পাওয়ার যে কষ্ট তা কিছুটা লাঘব হয়। মিসরের রীতি অনুযায়ী ফজরের নামাজের পরপরই ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। এরপর সবাই মিলে যে যেভাবে পারে, সেভাবে একেক রকম খাবার পরিবেশন করে। তবে আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকে দেশীয় খাবারের প্রতি। যেমন লাচ্ছা সেমাই, পায়েস, সাদা পোলাও, মুরগি ভুনা, বুটের ডাল দিয়ে গরুর মাংস প্রভৃতি। কখনও কখনও সবাই মিলে কোনো এক দর্শনীয় জায়গায় বেড়াতে চলে যাই। বাংলাদেশে নিজের পরিবার নিয়ে ঈদ করার আনন্দের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না, প্রবাস জীবনে নামমাত্র তা কাটিয়ে দিই।

সর্বশেষ..