প্রবাসে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক

গত বুধবার সৌদি আরবের জেদ্দায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ছয় বাংলাদেশি শ্রমিক। আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। বাংলাদেশি শ্রমিক বহনকারী একটি মিনিবাসের চাকা বিস্ফোরিত হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। খুবই দুঃখজনক যে, প্রবাসীদের মৃত্যুর খবর নতুন নয়। ক’মাস আগেই রিয়াদে আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি শ্রমিকরা লাশ হন। তাদের এসব মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে আসছে প্রায়ই। তা সত্ত্বেও প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুহার কমাতে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে মনে হয় না।
লক্ষ করা গেছে, প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে অস্বাভাবিক মৃত্যুহার বেশি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ৯৪ শতাংশ প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা ও হৃদরোগ। এছাড়া আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ডে বিদেশে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক শ্রমিক। বেশিরভাগেরই বয়স ২৫ থেকে ৪০-এর মধ্যে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট এসব তরুণ আর্থিক নিরাপত্তার আশায় উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে বা সম্বলটুকু বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের কষ্টার্জিত অর্থই আমাদের বৈদেশিক আয়ের বড় উৎস। কিন্তু প্রবাসে তাদের সুরক্ষায় সরকারের প্রচেষ্টায় ঘাটতি রয়েছে। বিদেশে শ্রমিকদের মৃত্যুর বর্ধিষ্ণু হার দেখেও এমনটা মনে হয়।
সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান ও কুয়েতের মতো দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। এসব দেশ থেকে মরদেহও আসছে সবচেয়ে বেশি। গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাইয়ে মৃত প্রবাসীর যথাক্রমে ৭৭ ও ৪৯ শতাংশই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। গত বছর কেবল মালয়েশিয়ায় মারা গেছেন ছয় হাজারের বেশি বাংলাদেশি। এখনও প্রায় প্রতিদিন আসছে প্রবাসীর মরদেহ।
দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শেষে এসব প্রবাসীর সময় কাটে নানামুখী দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপের মধ্যে। পরিবারের জন্য উৎকণ্ঠা, ভিসার মেয়াদ-সংক্রান্ত জটিলতা, দেনা শোধের চাপ কিংবা কাজ হারানোর শঙ্কার মধ্যে কাটে তাদের দিন। এতে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত হন অনেকে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব, অস্বাস্থ্যকর আবাসন, পুষ্টির অভাব, বিরূপ আবহওয়া প্রভৃতি কারণেও ঝরে যাচ্ছে অনেক তাজা প্রাণ। সরকারের আন্তরিক আগ্রহ থাকলে এর সমাধান অসম্ভব নয়। অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলেও তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট হওয়া দরকার।
বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে। ভিনদেশে সাবলীলভাবে টিকে থাকার জন্য ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও কারিগরি জ্ঞান বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে শ্রমিকদের জীবন আরও সহজ হবে। ওইসব দেশে অবস্থিত দূতাবাসের সহায়তায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের তদারকি আরও মজবুত করতে হবে। অভিবাসনে মৃত্যুহার কমাতে হলে অবৈধ পথে বা অসৎ দালালের মাধ্যমে বিদেশ গমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে দায়ী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হতে হবে যত্নবান। এছাড়া চুক্তির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকার আরও দক্ষতার পরিচয় দেবে বলে আমরা আশা করি। শ্রম রপ্তানিতে শ্রমিকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। বিদেশে তাদের বিনোদন ও স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি শ্রমিককে পর্যাপ্ত বিমা সুবিধার আওতায় আনাও কঠিন নয়। মোটকথা, প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় মনোযোগী হওয়া সরকারের বড় দায়িত্ব।