প্রভাব রাখুক রায়টি

জাকিয়া সুলতানা রূপাকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করে সড়কের পাশে ফেলে রেখে যারা স্বাভাবিকভাবে জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছিল, সে পরিবহন শ্রমিকদের কঠোর দণ্ড হয়েছে টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। ছয় মাসেরও কম সময়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ মামলার বিচারিক নিষ্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই ধন্যবাদ পাবেন।
যাত্রী পরিবহনকারী বাসে নারীর জন্য অস্বস্তিকর অনেক কিছু ঘটে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এর কিছু উপেক্ষা করতেও শিখে যান তারা। সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ আশা এবং আলোচনাও করেন যে, ধীরে ধীরে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এরই মধ্যে যখন ঘটে যায় বাসে একা যাতায়াতকারী কোনো নারীকে ওই বাহনেরই কর্মী দ্বারা দলবদ্ধ নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনাÑতখন সেটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
রূপাকে ধর্ষণের পর মেরেও ফেলা হয়েছিল এবং লাশটি বাইরে নিক্ষেপ করে পালিয়ে গিয়ে দুর্বৃত্তরা ভেবেছিলÑরেহাই পেয়ে যাবে। সেটি যে শেষ পর্যন্ত ঘটেনি, তাতে আমরা কিছুটা হলেও স্বস্তি প্রকাশ করছি। এজন্য মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তাসহ আদালতে যারা দোষীদের অপরাধ প্রমাণে নিয়োজিত ছিলেন, বিশেষত তাদের প্রশংসা করব। বলব, এ ধরনের প্রয়াস থাকলে অন্যান্য মামলায়ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে সমাজে এর সুফল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চার আসামির মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি যে বাসে ওই ঘটনা ঘটেছিল, সেটির মালিকানা মেয়েটির পরিবারকে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি রোজগারেও মনোনিবেশ করেছিলেন রূপা। কর্মজীবী হয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ব্রত ছিল তার। সেই সংগ্রামের কাহিনী পড়েও আমরা দুঃখশোকে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম। এ প্রেক্ষাপটেই আদালত সম্ভবত ওই রকম একটি আদেশ জারি করেছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পক্ষকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে একটি রায় সম্প্রতি আলোচিত হয়েছে। রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার নিষ্পত্তিতে বাসের মালিকানা বদলবিষয়ক আদেশও মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। এর মধ্য দিয়ে আদালত পরিবহন মালিকদের যে বিশেষ বার্তাটি দিতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট। যাত্রীবাহী বাসে নারীসহ সব যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও যে এ ব্যবসার অপরিহার্য শর্ত, এটা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা রয়েছে রায়টিতে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতেও যাত্রীবাহী বাসে একাকী নারীকে ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা রয়েছে। তা নিয়ে সামাজিক আন্দোলনও আমরা লক্ষ করেছিলাম। বাংলাদেশে রূপা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার কিছুদিন পর। আমরা জানি না, দ্বিতীয় ঘটনায় প্রথমটির প্রভাব ছিল কি না। তবে এর যে দ্রুত ও ব্যতিক্রমী নিষ্পত্তি হয়েছে আদালতে, সেটা তাৎপর্যবহ। আমরা আশা করব, এ মামলায় আপিল হলে তারও দ্রুত নিষ্পত্তিতে উদ্যোগী থাকবেন উচ্চ আদালত।
বিচারিক আদালতের এমন নিষ্পত্তি সমাজের বিস্তৃত পরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে যে দৃঢ় বার্তা দিতে চাইছে, সেটি অক্ষুণœ থাকবে বলেই আমরা আশাবাদী। এ ধরনের অপরাধীদের শাস্তি দৃষ্টান্তমূলকই হতে হবে এবং তা ব্যাপকভাবে প্রচার করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নারীর মনে স্বস্তি আর সাহসও জোগাতে হবে বৈকি।