‘প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সাফল্য। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার ‘ক্যাম্পাস টু করপোরেট’-এর ট্রেইনার ও লিড কনসালটেন্ট হোমায়রা শারমিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

হোমায়রা শারমিন তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাম্পাস টু করপোরেট’-এর ট্রেইনার ও লিড কনসালটেন্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরে এমবিএ করেন মার্কেটিং ও মানবসম্পদ (এইচআর) ব্যবস্থাপনায়। প্রায় ২০ বছরের কর্মজীবনে দেশীয় ও বহুজাতিক বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এবং এইচআর বিভাগসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ অরগানাইজেশন ফর লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বোল্ড) ট্রাস্টি মেম্বার ও বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের (বিএসএইচআরএম) একজন সহযোগী সদস্য

শেয়ার বিজ: ফার্মাসিস্ট থেকে এইচআর পেশায় কীভাবে এলেন?

হোমায়রা শারমিন: এইচআরে ক্যারিয়ার গড়ব এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ফার্মেসিতে পড়ার সুযোগ হয়। এ কারণে ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হয়ে যাই। স্নাতক শেষে ফ্যাক্টরিতে ইন্টার্নশিপ করি। ওই সময় আমার এ বিষয় সম্পর্কিত কাজ খুব একটা পছন্দ হয়নি। মূলত তখন থেকেই ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা শুরু হয় আমার। ছোটবেলা থেকে মানুষের সঙ্গে মিশতে কিংবা চলতে পছন্দ করি। তাই মার্কেটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নিই। ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে কাজ করি। এরপর এইচআর নিয়ে পড়ালেখা করি; পরবর্তী সময়ে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ শুরু করি।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই…

হোমায়রা শারমিন: প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা বিষয়াদি নিয়ে কাজ করাকে বলা হয় ‘হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’ (এইচআরএম)। ট্রেনিং, লার্নিং, ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কিত কাজকে বলা হয় ‘হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট (এইচআরডি)’। প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মী নিয়োগের পর তাকে নানা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হয়। এতে তার কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিষ্ঠান তার কাছ থেকে যথাযথ আউটপুট পেয়ে থাকে। আবার অ্যান্ট্রি লেভেলের একজন ম্যানেজারকে নিয়মিত এভাবে ডেভেলপের মাধ্যমে মিড লেভেলের ম্যানেজার কিংবা সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ বিষয়গুলো অনুসরণ করা হলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বিদেশ থেকে সিনিয়র ম্যানেজার পদের জন্য কর্মী আনার প্রয়োজন পড়ে না। কেবল প্রতিষ্ঠানই নয়, একটি দেশেরও হিউম্যান রিসোর্স প্ল্যান থাকা উচিত। উন্নত সব দেশেই এমন পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের দেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। মানুষকে ট্রেনিং ও ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে এই অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। তাই ট্রেনিং কিংবা ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট বা লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ছাড়া প্রতিষ্ঠান যেমন এগোতে পারে না, তেমনি দেশও এগোতে পারে না।

শেয়ার বিজ: আমাদের দেশে এইচআর নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়?

হোমায়রা শারমিন: আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে এইচআর ম্যানেজারদের যথাযথভাবে ক্ষমতায়ন করা হয় না। ধরুন, অর্থ ব্যয় করে কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো প্রয়োজন। এইচআর ম্যানেজারকে এর অনুমতির জন্য প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পর্যন্ত যেতে হয়। অনেক সময় সিইওকে তিনি বোঝাতে পারেন না; আবার অনেক সময় সিইও বুঝতে চান না। অর্থাৎ সে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আর হয় না। সুতরাং সিইও কিংবা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এইচআরের বিভিন্ন কাজের গুরুত্ব বোঝানো বেশ চ্যালেঞ্জের। এজন্য সিইওকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ভূমিকা সম্পর্কে জানতে হবে, বুঝতে হবে।

শেয়ার বিজ: বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারীকর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও ক্রমেই উচ্চপর্যায়ে এ সংখ্যার হার কমতে থাকে। কিংবা নেতৃত্ব দিচ্ছে এমন নারীকর্মীর সংখ্যাও নগণ্য, এর কারণ কী?

হোমায়রা শারমিন: প্রথমত নারীরা চাকরির জন্য কম আবেদন করে। চাকরির আবেদন বাড়লে তা পাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। আরেকটি বিষয়ও লক্ষ্য করা যায় আর তা হলো অনেকে পড়ালেখা করেন মার্কেটিংয়ে কিন্তু মার্কেটিংয়ে নানা চ্যালেঞ্জ আসতে পারে; এজন্য ওই বিভাগে চাকরির আবেদন না করে এইচআরের জন্য আবেদন করেন। এতে বোঝা যায় নারীরা চাকরির ক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন কিংবা পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। তখন তিনি আপস করেন। পড়ালেখার সঙ্গে তাই ক্যারিয়ার গঠনে অমিল দেখা যায়। অর্থাৎ যে বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন, সে বিষয়টিকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্য সেক্টরে চাকরির আবেদন করেন। পরে একটা সময় সামাজিক, পারিবারিক ও কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যায়; ফলে তারা পিছিয়ে পড়েন। তবে নারীরা অনেক এগিয়ে গেছে। বর্তমানে বহু প্রতিষ্ঠানে নারীরা সিনিয়র পদে দায়িত্বরত। অদূর ভবিষ্যতে নারীরা বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে আরও এগিয়ে যাবে বলে মনে করি।

শেয়ার বিজ: টপ ম্যানেজমেন্টে নারীকর্মীদের আরও অংশগ্রহণের জন্য কী কী বিষয় জরুরি বলে মনে করেন…

হোমায়রা শারমিন: নারীদের এগিয়ে আসার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকেও এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে নারীবান্ধব পরিবেশের সৃষ্টি করতে হবে। মেধার দিক দিয়ে নারীরা পুরুষের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। বরং বলা হয়, প্রতিষ্ঠানে অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় নারীরা পুরুষের তুলনায় এগিয়ে থাকে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নারীদের উৎসাহ দিতে হবে। নারীদের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। যেমন একই পদে দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও পুরুষের তুলনায় নারীকে বেতন কম দেওয়া হয়। এ ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রেরণার জন্য কিছু বলুন…

হোমায়রা শারমিন: কর্মজীবনে প্রবেশের পর কোনো বাধা এলে নারীদের থেমে যাওয়া উচিত নয়। ধৈর্যের সঙ্গে যদি দায়িত্ব পালন করা যায়, তবে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। পারিবারিক কোনো কারণে যদি কখনও ব্রেক নিতে হয়, তবে একেবারে হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কিছু করার ইচ্ছা থাকতে হবে। ইচ্ছাশক্তিই নারীকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে।

শেয়ার বিজ: যারা এইচআর নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী বা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন…

হোমায়রা শারমিন: মানুষ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থাকতে হবে। মানুষকে বুঝতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। এইচআর পেশায় সততার কোনো বিকল্প নেই। নিজেকে রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।