মত-বিশ্লেষণ

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকার নারীদের স্বাবলম্বী করতে হবে

কামরুন নাহার: মেয়েটির নাম রাজিয়া (ছদ্মনাম)। বয়স আর কতই হবে, বড়জোর পঁচিশ। দশ বছর বয়সে ওকে বিয়ে দিয়ে দেন বিধবা মা। স্বামীর সংসারে নিত্য অভাব দেখে তাঁত বোনা শেখে রাজিয়া। ওর স্বামীও তাঁতি। যদিও নিজেদের তাঁত নেই। সারাদিনে দু’জন মিলে দশটার মতো গামছা বুনতে পারে। বিনিময়ে মহাজনের কাছ থেকে দিনে পায় ১২৫ টাকা করে। সঞ্চয়ী রাজিয়া তার মজুরি সবটা খরচ করে না। একটু একটু করে জমায়। জমানো ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে সংসারে অশান্তি শুরু হয়। স্বামীর আবদার রাজিয়া তার সঞ্চয়ের টাকা স্বামীর হাতে তুলে দিক। রাজিয়া তার মেয়ে তিনটির কথা ভেবে টাকাটা দিতে নারাজ। শুরু হয় কথাকাটি ঝগড়া। তারপর মারধর। শেষে মেয়ে তিনটিকে রেখে স্বামী ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। কোথায় যাবে রাজিয়া। বিধবা মায়ের নিজেরই তো চলে না। এর ওপর সন্তান ছেড়ে থাকার কষ্টে রাজিয়া দিশাহারা। এ নির্যাতনের প্রতিকার কোথায়?
রাজিয়ার মতো এমন নির্যাতনের শিকার নারীদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায়ই দেখা যায়। অথচ দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী তার অধিকার পাবে, প্রাপ্য মর্যাদা পাবে, উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ সমানুপাতিক হবে এমন আশা আমরা করতেই পারি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাজিয়ার মতো নির্যাতিত, বৈষম্যের শিকার নারীদের হাহাকার ভাসে বাতাসে, মজুরি ক্ষেত্রে, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে, সুষম খাদ্যের সমবণ্টনে, উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণে, সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা এখনও পিছিয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সুষম উন্নয়নের স্বার্থে লিঙ্গ সমতাভিত্তিক একটি সমাজ বিনির্মাণের অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী ও পুরুষের সমঅধিকারের নিশ্চয়তা দিয়ে একে সাংবিধানিক অঙ্গীকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে বর্তমান সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্বে জেন্ডার সমতা ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোল মডেল। এ দেশের নারীরা এগিয়ে চলার পথ খুঁজে পেয়েছে। নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে জীবনের প্রতিটি ধাপে নারীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে নারীর প্রাপ্য অধিকার ও সমমর্যাদায় তাকে অধিষ্ঠিত করতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১ প্রণীত হয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষিত নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদে অন্যতম স্বাক্ষরদাতা বাংলাদেশ। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য ও নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে সরকার প্রচলিত কিছু আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করেছে। কিছু নতুন আইনও প্রণয়ন করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং পারিবারিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সরকার কঠোর শাস্তির বিধান রেখে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা ২০১৩, ডিএনএ আইন ২০১৪, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এবং যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ প্রণয়ন করেছে। এর সঙ্গে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-এর সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহ মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ (সংশোধিত) পারিবারিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নারীর প্রতি পারিবারিক পর্যায়ে সংঘটিত সহিংসতা প্রতিরোধ করতে নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৬৭টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন। সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করতে ১০৯ নম্বরের একটি হটলাইন স্থাপন করেছে। যে কোনো নির্যাতনে নারী এই ১০৯-এ কল করে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। সরকার নির্যাতিত নারীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ছয়টি বিভাগীয় শহরে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, মহিলা সহায়তা কর্মসূচি এবং গাজীপুর জেলায় নারী ও শিশু-কিশোরী হেফাজতিদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে রাজিয়াদের মতো নির্যাতিত নারীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য।
যে গল্প শুরুতে বলেছিলাম, সে রাজিয়া বা তার মতো মেয়েরা হয়তো এসব ব্যবস্থার কথা জানেই না। নারীকে স্বাবলম্বী করতেও সরকার নানা রকম পদক্ষেপ নিয়েছে। জীবিকায়নের জন্য নারীদের দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুস্থ, অসহায় ও শিক্ষিত বেকার নারীদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কাজে পারদর্শী করে তোলা হচ্ছে যেন তারা আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে। এক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার ব্যবস্থাও করেছে সরকার। জয়িতা ফাউন্ডেশন তেমন একটি নারীর ব্যবসাবান্ধব বিপণন নেটওয়ার্ক। এছাড়া জাতীয় মহিলা সংস্থার উদ্যোগে নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারজাত করার জন্য জয়িতা ছাড়াও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সংলগ্ন ৩০টি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেছে সরকার।
কাজেই নারী আজ একা নয়। নির্যাতিত অবহেলিত, দুস্থ, স্বামী পরিত্যক্তা, ল্যাকটেটিং মাদার, শিক্ষিত বেকার নারী সকলের পাশে রয়েছে সরকার। তাদের কল্যাণে পাশাপাশি কাজ করছে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। রাজিয়ার মতো নির্যাতিত নারীদের রুখে দাঁড়াতে হবে সাহসের সঙ্গে। কারণ রাজিয়ারা আর একা নয়। তাদের প্রতি সবল ও দৃঢ় হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আজকের এই নারীবান্ধব সরকার এবং উন্নয়নকামী নারীর প্রতি সহমর্মী আত্মপ্রত্যয়ী এক জনগোষ্ঠী।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..