প্রশ্নবিদ্ধ ডিমিউচুয়ালাইজেশন!

পুঁজিবাজার গতিহীন

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে কোনো গতি নেই। টানা মন্দার কবলে বাজার। প্রতিদিন প্রায় সব ধরনের শেয়ারের দর কমছে। কমছে লেনদেন। বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায়। তার পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো বিকার নেই, নেই কোনো সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের তীর ডিমিউচুয়ালাইজেশনের (মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথক্করণ) দিকে। তাদের অভিমত, ডিমিউচুয়ালাইজেশনের আগে অনেক স্বপ্ন দেখানো হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। বাজারে গতি ফেরাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, পাঁচ বছরেও দেশের স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশনের কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ডিমিউচুয়ালাইজেশন যেন ‘গলার কাঁটা’। ২০১৩ সালে স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশন হওয়ার পরে ভালো মৌল ভিত্তির কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। বাজারে চালু হয়নি নতুন কোনো পণ্য। পুঁজিবাজারকে ব্র্যান্ডিংয়ে ব্যর্থ তারা। এ কারণেই ডিমিউচুয়ালাইজেশনের কোনো সুফল বাজারে লক্ষ করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধসের পরে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে স্টক এক্সচেঞ্জে ডিমিউচুয়ালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপরে জাতীয় সংসদে ‘এক্সচেঞ্জেস ডিমিউচুয়ালাইজেশন অ্যাক্ট ২০১৩’ পাস হয়। একই বছরের মে মাসে গেজেট প্রকাশের পরে শুরু হয় ডিমিউচুয়ালাইজেশন কার্যক্রম। এতে নতুন আশায় বুক বাঁধে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এর পাঁচ বছর পরেও তাদের আশা এখনও হতাশার মধ্যেই রয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশন যথাযথভাবে হয়নি। বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জে ৪০ শতাংশ ট্রেকহোল্ডার রেখে প্লেয়ারদের সঙ্গে মিউচুয়ালাইজড করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেকহোল্ডাররা পুঁজিবাজারের মূল সমস্যা। তারাই ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে পতনের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন তিনি।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতে, দেশের পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের করতে ডিমিউচুয়ালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে আইন পাস হলেও দীর্ঘ পাঁচ বছরে কোনো সাফল্যের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এখনো সুদূরপরাহত। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরে বাজারে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। ডিমিউচুয়ালাইজেশন-পরবর্তী নতুন পণ্য পুঁজিবাজারে চালু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা আলোর মুখ দেখেনি।

ঢাকার বিনিয়োগকারী রফিকুল ইসলাম স্বপন শেয়ার বিজকে বলেন, আশা ছিল নির্বাচনের বছর বাজার ভালো থাকবে, কিন্তু তা হচ্ছে না। তবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আচরণ সন্দেহজনক। বাজার স্বাভাবিক করতে ডিএসইর কোনো উদ্যোগ নেই। সূচকের এ অবস্থানের জন্য ডিমিউচুয়ালাইজেশনকে দায়ী করেন তিনি।

অপর এক বিনিয়োগকারী দিলরুবা ইয়াসমিন জানান, ডিমিউচুয়ালাইজেশন-পরবর্তী একটি ভালো মানের কোম্পানি বাজারে আনতে ব্যর্থ হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। বিনিয়োগকারীরা ডিমিউচুয়ালাইজেশনের কোনো ইতিবাচক ফল পাচ্ছে না। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি এই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর।

ডিএসইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম শেয়ার বিজকে বলেন, যে লক্ষ্যে আমরা ডিমিউচুয়ালাইজেশন করেছি, সে লক্ষ্যে এখনও পৌঁছাতে পারেনি। এর সুফল পুরোপুরি পেতে আরও সময় লাগবে। তবে কিছুটা হলেও পেতে শুরু করেছি, যা পুঁজিবাজারের জন্য সুখবর। সদস্যদের কোনো হস্তক্ষেপ দেখছি না। স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক সব সময়ই গুরুত্ব পাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি নেই। ধসের পর বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস ফেরাতে যে ব্র্যান্ডিংয়ের দরকার ছিল, সেটি হয়নি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ও বাজারে ভালো কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে ভালো মার্কেটিং করতে স্টক এক্সচেঞ্জগুলো ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

তিনি বলেন, ব্যবসা করতে হলে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর উচিত ব্যবসায়িক প্রকল্প হাতে নিয়ে আমার কাছে আসা, কিন্তু তারা সেটি করেন না। উল্টো আমাকে তৈরি হয়ে আপনাদের কাছে যেতে হচ্ছে। স্টক এক্সচেঞ্জের বিপণন (মার্কেটিং) দুর্বলতার জন্য বাজারে ভালো কোম্পানি নেই।

এদিকে সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ডিএসই জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ বিভিন্ন মহলের। পুঁজিবাজার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মো. তৌফিক হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ভালো কোম্পানি না আসার একটা বড় কারণ হলো আমাদের শেয়ারবাজারটা সামষ্টিক অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠতে পারেনি। এখনও আমরা ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি। ভালো শেয়ার আনতেই হবে। এছাড়া ডিমিউচুয়ালাইজেশন বলেন আর কৌশলগত পার্টনারশিপ বলেন, কোনো লাভ নেই। ভালো কোম্পানি না আসার আরেকটা কারণ হলো, আমরা তাদের আকৃষ্ট করতে পারছি না।

এ প্রসঙ্গে গত সোমবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ঠিকমতো ভূমিকা পালন করছে না। যে কারণে পুঁজিবাজার অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশন (মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথিক্করণ) আইনে ২০১৬ সালের মধ্যে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে স্টক এক্সচেঞ্জের সংরক্ষিত ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা ছিল। এখনও কোনো স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত বিনিয়োগকারী চূড়ান্ত করতে পারেনি। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের শর্ত অনুযায়ী, ব্লকড হিসেবে থাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ৬০ শতাংশ শেয়ার কৌশলগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জের মোট শেয়ারের ২৫ শতাংশ (সংরক্ষিত শেয়ার থেকে) কৌশলগত বিনিয়োগকারীর কাছে এবং বাকি ৩৫ শতাংশ শেয়ার আইপিও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রি করতে হবে। অন্যদিকে ৪০ শতাংশ শেয়ারের মালিক স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য বা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান।