মত-বিশ্লেষণ

প্রস্তাবিত বাজেট ও একটি পর্যালোচনা

ড. শামসুল আলম: সরকারি অর্থের মালিক মূলত জনগণ। সুতরাং সুচারুভাবে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের জনসাধারণ কীভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পারে, বাজেটে সে সম্পর্কে দিকনির্দেশনা থাকে এবং এটাই প্রত্যাশিত। তাই সরকারের বার্ষিক বাজেট রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম পথনির্দেশক দলিল। প্রস্তাবিত বাজেট সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বাজেট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের এটা ১৭তম বাজেট।
সরকারের এক দশকের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বর্তমান সরকারের হাতে নেওয়া বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানো, স্থানীয় শিল্পে প্রণোদনা, কৃষি ও জ্বালানি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ার অঙ্গীকার রয়েছে এ বাজেটে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১৩ লাখ বাড়িয়ে ৮৭ লাখে উন্নীত করাসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি-বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে এ বাজেটে। প্রস্তাবিত বাজেটে নদীভাঙন-কবলিত জনসাধারণের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নে এটা সমীচীন এবং যুগোপযোগী হয়েছে। কারণ প্রতি বছর নদীভাঙনের ফলে প্রায় ৫০-৬০ হাজার পরিবার সহায়-সম্বল হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ে। এজন্য গরিববান্ধব এ সরকার অবশ্যই ধন্যবাদ পাবে। আমরা আশা করব, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সব হতদরিদ্র মানুষ কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আসবে। এছাড়া বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা উৎসাহব্যঞ্জক। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল রাখার ব্যবস্থাকে সাধুবাদ জানাই। এতে বেকার যুবকরা ব্যবসা ও উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী হবেন। ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। উল্লেখ্য, কর্মবাজারে সক্ষম পুরুষদের অংশগ্রহণ ৮২ শতাংশ এবং নারীদের মাত্র ৩৬ দশমিক তিন শতাংশ। আমাদের শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও অনেক কম। তাই শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য তাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর এ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই।
মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান বর্তমানে ১৩ দশমিক ছয় শতাংশ। জিডিপিতে কাক্সিক্ষতভাবেই কৃষি খাতে অবদান কমেছে, শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বাংলাদেশ সরকার দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কৃষি উন্নয়নকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রাধিকার দিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সামগ্রিকভাবে কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকরণ, কৃষক ও সম্প্রসারণ জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাকে উন্নত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষায়িত সেবা প্রদান, রফতানি উপযোগী কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ, চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচলনসহ কৃষি কার্যক্রম বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন করা। কৃষিবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার সার, বীজ, সেচসহ কৃষি উপকরণে ভর্তুকি প্রদানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। আর্থসামাজিক উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা ও বিশ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদেই বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকির প্রয়োজন রয়েছে। কৃষির উন্নয়নের জন্য স্বাভাবিক বিনিয়োগের অতিরিক্ত হিসেবে কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ও কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট প্রদান অব্যাহত থাকবে বলে বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় ফসলের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন কার্যক্রমে গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। বন্যা, খরা, লবণাক্ত ও অধিক তাপমাত্রাসহিষ্ণু ফসল এবং বহুমুখী পাটপণ্য উদ্ভাবনের গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়েও বাজেটে সুপারিশ করা হয়েছে। ফসল কর্তন ও পরবর্তী কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় কাজগুলো যান্ত্রিকীকরণে কৃষকদের উৎসাহিত করতে এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে বাজেটে। দেশে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডধারী প্রায় দুই কোটি আট লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন কৃষক এসব সুবিধা পাবেন। কৃষি খাতের প্রধান উপকরণগুলো, বিশেষ করে সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি আমদানিতে শূন্য শুল্কহার অব্যাহত রাখা হয়েছে। মৎস্য, পোলট্রি ও ডেইরি খাতের টেকসই উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে এ খাতের খাদ্যসামগ্রী ও বিভিন্ন উপকরণ আমদানিতে বিগত সময়ে প্রদত্ত রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রেখে নতুন উপকরণ ও যন্ত্রপাতিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে এ বাজেটে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে গত কয়েকটি বাজেটের মতো কৃষিক্ষেত্রে প্রণোদনা ৯ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। জাতীয় বাজেটের আকার ক্রমে বৃদ্ধি পেলেও কয়েক বছর ধরে এ ভর্তুকির পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকায় স্থির রয়েছে এবং জাতীয় বাজেটে এর অংশীদারিত্ব ক্রমহ্রাসমান। উল্লেখ্য, গত পাঁচ বছর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির গড় হার ছিল পাঁচ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি বছর ওই ভর্তুকির প্রকৃত মূল্য ক্রমান্বয়ে কমেছে পাঁচ দশমিক ৮৮ শতাংশ হারে। এই ৯ হাজার কোটি টাকা গত পাঁচ বছর প্রায় ৩০ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। এ তথ্য এটাই নির্দেশ করে যে, কৃষিতে প্রকৃত সরকারি ভর্তুকি বাড়েনি।
কৃষি খাত সবচেয়ে বড় ব্যক্তি খাত এবং উৎপাদন ও পণ্য বিক্রয়-বণ্টন সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণÑএ কারণেই শস্য উৎপাদনে কৃষকরা স্বাভাবিক মুনাফা অর্জনেও প্রায়ই ব্যর্থ হন। আর জলবায়ুনির্ভর কৃষিতে ঝুঁকিও সবচেয়ে বেশি, যে কারণে কৃষিতে ব্যাপক ভর্তুকি সমর্থন দিয়ে যেতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানির ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। এ থেকে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি থেকে কৃষকদের রক্ষার্থে ‘শস্য বিমা’ পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা হবে বলে এ বাজেটে উদ্যোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকার গবাদিপশু বিমা চালু করা, দরিদ্র নারীদের ক্ষুদ্র বিমার আওতায় আনার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির পরিকল্পনাও নিয়েছে। সাধারণ বিমা পাইলট ভিত্তিতে একবার শস্য বিমা চালু হয়েছিল, কৃষকের সংখ্যাধিক্য ও আবহাওয়ানির্ভর কৃষি হওয়ায় সেটা অতীতে ব্যর্থ হয়েছিল। সরকারি পর্যায়ে শস্য বিমা চালু করলে এর ঝুঁকির সম্ভাবনা ও ভর্তুকির চাপ অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে এবং বাস্তবায়নে সতর্ক হতে হবে।
বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, কৃষির উৎপাদন এক শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্যের হার শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ হ্রাস পায়। অর্থনীতির অন্যান্য খাতের চেয়ে দারিদ্র্য মোচনে কৃষি খাতের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রভাবই বেশি। কারণ তাতে জনপ্রতি খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা বাড়ে, খাদ্যশস্যের মূল্যে স্থিতিশীলতা বিরাজমান থাকায় তাতে সাধারণ মানুষের ক্রয় অভিগম্যতা বৃদ্ধি পায়। ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে কৃষি খাতের আধুনিক ও কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারকে আরও পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। এসডিজিতে ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষি উৎপাদিকা ও কৃষি আয় দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছে। আমরা সে লক্ষ্য অর্জনে কীভাবে এগোব, কৃষিবিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলোকে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এটা করা গেলে ভর্তুকি বৃদ্ধির যথার্থতা প্রতিভাত হবে।
কৃষির প্রচলিত উৎপাদন ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর করার জন্য পুঁজির সঞ্চার ঘটাতে হবে। তাছাড়া কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপনে এবং এর বিপণনে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন। কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপন কম করে হলেও এক দশকের জন্য কর অবকাশ ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেতে পারে।
কৃষিপণ্যের যথাযথ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারা এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হওয়া কৃষি রূপান্তরের বড় বাধা। ফলে কৃষি ফসল খাতের প্রবৃদ্ধিও কমছে। বিভিন্ন সময় কৃষিপণ্যে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় কৃষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে শস্য রেখে ফল বাগানে ঝুঁকছেন। বর্তমানে বোরো কর্তনের ভরা মৌসুমে ধানের দাম এখন উৎপাদন খরচের নি¤েœ চলে গেছে। এটা কৃষকদের জন্য হতাশাজনক। সরকার ধান ক্রয় জোরদার করেছে, তবে সমাধানের জন্য এটা শেষ কথা নয়। সারা দেশে সরকারের ক্রয় কেন্দ্র ও সংরক্ষণ কাঠামো নেই। কোটি কোটি ক্ষুদ্র ক্রেতা থেকে বিভিন্ন মানের অল্পস্বল্প করে ধান ক্রয় অবশ্যই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে। এজন্য ব্যক্তি খাতে আমাদের চাল রফতানির দিকে ঝুঁকতে হবে। চালে এখন বাংলাদেশ শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, চালে উৎপাদন এখন উদ্বৃত্ত। কিন্তু এতেও নানা সমস্যা আছে। চালের রফতানি বাজার ৩০ শতাংশ ভারতের দখলে। ভারতের চাল উৎপাদন খরচ বাংলাদেশের চেয়ে কম, সে কারণে ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের চাল রফতানির বাজারে প্রবেশ কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও খরচ কমিয়ে আনার জন্য সরকারকে অবশ্যই গবেষণা ব্যয় ব্যাপক বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে গবেষণার জন্য ৫০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ স্বল্প হলেও অত্যন্ত সময়োপযোগী। রফতানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এর বিকল্প নেই। চাল আমদানিকারক দেশও খুব বেশি নেই। যে চাল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, ইরান আমদানি করে, সে মানের চাল (লংগ্রেন) অথবা আঠালো চাল আমরা কমই উৎপাদন করি। চীন আমাদের থেকে আমদানি করবে না, কেননা তারা চায় আঠালো চাল (গ্লুটিনাস রাইস)। বাংলাদেশ যে চাল আমদানি করে, সেটিও লংগ্রেন ও সরু মানের চাল। এসব চালের দাম বাড়লে বিশেষ শ্রেণির ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কৃষকের তেমন লাভ হবে না। বর্তমান আমদানিকারকরা নিশ্চিত রফতানিকারক ছেড়ে নতুন রফতানিকারকে হঠাৎ ঝুঁকে যাবে কি না, সেটা বলা কঠিন। তাই বেসরকারি খাতে দেশেই চাল মজুদের জন্য মজুদদারদের উৎসাহ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে চালের বাজারই সব কৃষিপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক। এ পণ্যের কোটি কোটি উৎপাদক, লাখ লাখ খুদে ব্যবসায়ী, হাজার হাজার মজুদদার দেশব্যাপী ছড়িয়ে আছেন। ব্যক্তি পর্যায়ে চাল ব্যবসার জন্য গুদাম নির্মাণকে উৎসাহ ও প্রণোদনা দিতে হবে। তাই সরকারকে শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেই চলবে না, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে বাজার ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে। কৃষিবাজার ব্যবস্থা শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ধান-চালের ব্যবসায় হস্তক্ষেপ নয়, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটকে মোটা দাগে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব বাজেট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। স্থানীয় বিনিয়োগ বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও মোবাইল সেট এবং কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি উদ্যোগগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক। অন্যদিকে নতুন করারোপ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চিনি, ভোজ্যতেল, গুঁড়া দুধ, তৈজসপত্রের দাম বাড়ানোর প্রচেষ্টা যে কোনো জনপ্রিয় সরকারকে পরিহার করতে হবে। শিশুখাদ্যের অন্যতম উপাদান গুঁড়া দুধ। গুঁড়া দুধ শিশুদের পুষ্টির চাহিদা মেটায়। দাম বাড়ানোর ফলে অনেকেরই তা হাতের নাগালের বাইরে যেতে পারে। এতে নারী ও শিশুদের শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেবে। আমাদের দেশে পুষ্টি সমস্যা এখনও প্রবল। তাই গুঁড়া দুধের দাম বাড়ানোর বিষয়টি পুনরায় বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় তরল দুধের চাহিদা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সরকারকে এক্ষেত্রে তরল দুধের মান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভোক্তারা আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত শিশুখাদ্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশীয় দুধের প্রতি আগ্রহী হন। দুধের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ার কারণে দেশের তরল দুধের বাজারদর কম। এছাড়া চিনি, ভোজ্যতেল এগুলো জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। চিনিতে এমনিতেই ভোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজার দামের চেয়ে প্রতি কেজিতে প্রায় ২০-২৫ টাকা বেশি দিয়ে কিনছেন, তার ওপর যদি দাম বাড়ানো হয়, তাহলে তা ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াতে পারে। চিনির ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষণ শুধু ভোক্তাকে ভোগাবে। ভোক্তাকে আমরা এভাবে কষ্ট দিতে পারি না। অতএব এগুলোর যাতে দাম না বাড়ে, সেদিক বিবেচনায় রাখতে হবে। তাছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে স্মার্টফোনের ওপর ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক বাড়ানো কিংবা ল্যাপটপের কর রেয়াত না দেওয়া যৌক্তিক কি না, ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই। কেননা এটা দ্রুত ডিজিটালাইজেশন গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে দেশীয় নানা শিল্পকে উৎসাহিত করতে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। দেশের ইলেকট্রনিক, পোলট্রি, মৎস্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি খাতে কর অব্যাহতি রাখায় এসব শিল্পের বিকাশে প্রণোদনা ইতিবাচক। আবার বিদ্যমান বড় শিল্প খাতের জন্যও নতুন প্রণোদনার প্রস্তাব আছে। যদিও তৈরি পোশাক খাতকে নতুন প্রণোদনা দিতে যে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকার অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে, সেটা কতটা যৌক্তিক ভেবে দেখতে হবে। প্রায় চার দশক ধরে পরিণত তৈরি পোশাকশিল্পে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। প্রণোদনা স্বল্প সময়ের জন্য দেওয়া উচিত, দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। এটা আর কতদিন চলবে, এ প্রশ্ন অনেকের মনেই রয়েছে। সরকারের গাঁটের পয়সা খরচ না করেও সার্বিক প্রণোদনা দেওয়া যায়। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, টাকার কিছুটা অবমূল্যায়ন হলে বরং রফতানিকারকরা বেশি প্রণোদনা পেতেন। ডলার ক্রয় করে করে টাকার
বিনিময় হার ধরে রাখা হচ্ছে অথবা টাকার অতিমূল্যায়িত ধারা অব্যাহত রাখা হচ্ছে। এ কারণেই কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বাড়ছে না এবং চলতি অ্যাকাউন্টও নেতিবাচক থাকছে। দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নি¤œ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে টাকার সীমিত অবমূল্যায়নের সুযোগ দিচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি পর্যায়ের করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্যাক্স কাঠামো ঠিক আছে। নতুন বাজেটে ভ্যাট রেয়াতের পরিমাণ অনেক বাড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে পুনরায় বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। কারণ আমাদের কর জিডিপি অনুপাতে বিশ্বের সবচেয়ে কম। উন্নয়নের জন্য আমাদের রাজস্ব আয় বাড়াতেই হবে। তাছাড়া ভ্যাটের হার স্তরীকরণে বিশেষভাবে পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনায় এবং এটা ব্যবসা ক্ষেত্রে ব্যাপক হওয়ায় মোট ভ্যাট আদায় কমে যেতে পারে। ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং রাজস্ব আদায়ে কাঠামোগত দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ইলেকট্রনিকস ফিসকল ডিভাইস দ্রুত সরবরাহে যেতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা ভ্যাট আদায়ে সক্ষম হন। ইলেকট্রনিকস ফিসকল ডিভাইস ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকেই ক্রয় করতে হবে। সরকার দিলে এগুলো কখনোই ভালো চলবে না।
রেমিট্যান্সের ওপর দুই শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নতুন। এতে হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে টাকা পাঠানোর প্রবণতা হয়তো হ্রাস পাবে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা না বাড়িয়ে দুই ধরনের বিনিময় হারের পরিবর্তে বরং বিনিময় হার যুক্তিসংগতভাবে কিছুটা অবমূল্যায়ন করা যেত। কারণ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের মুদ্রার বিনিময় হার কিছুটা অতিমূল্যায়িত হয়ে আছে বলে অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন। ডিভ্যালুয়েশন হতো সব রফতানিকারকের জন্য বাজারভিত্তিক ভালো প্রণোদনা। প্রণোদনার নামে জনগণের টাকা সরকারকে দিতে হতো না।
এবারের বাজেটে রফতানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, এজন্য বাজারকে প্রভাবহীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। এর মধ্যে রফতানি খাতে রফতানি আয়ের ওপর আগে দশমিক ২৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপিত ছিল। এবারের বাজেটে সেটি বাড়িয়ে এক শতাংশ করা হয়েছে। এ খাতে কর বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। রফতানির বিপরীতে যে বিকল্প নগদ সহায়তা দেওয়া হয়, তার বিপরীতে উৎসে কর ছিল তিন শতাংশ, প্রস্তাবিত বাজেটে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। এক্ষেত্রে কর বেড়েছে সাত শতাংশ, যা সুবিবেচনাপ্রসূত। করের জাল বাড়ানোর প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। এ প্রচেষ্টাকে সর্বস্তরের জনগণ স্বাগত জানাবে।

সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ জিইডি)
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন

সর্বশেষ..