প্রস্তুতি ছাড়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা অসম্ভব

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি দুর্বল’ শিরোনামের খবরটি অনেক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। এর আগের দিন রাজধানীর এক হোটেলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত ‘লুকিং বিয়ন্ড এলডিসি গ্রাজুয়েশন’ শীর্ষক সেমিনারে উঠে আসা বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয় প্রতিবেদনটি। সেখানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তিনি ও সানেম চেয়ারম্যান ড. বজলুল হকের পাশাপাশি ওখানে যারা আলোচনা করেছেন, তাদের প্রত্যেকেই দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব, সংশ্লিষ্ট সবাই তাদের চেনেন; যথা বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. কেএএস মুর্শিদ, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, পিআরআইর ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ, এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের সিইও আলী আহমেদ প্রমুখ। সেখানে প্রধান যেসব ইস্যু উঠে এসেছে, সেগুলো হলো এক. বিশ্ব বাণিজ্যে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ; দুই. এখানে এখনো ব্যবসা শুরুর অবকাঠামোগত ব্যয় অনেক বেশি; তিন. ভূমি ব্যয় আর বিদ্যুৎ খরচও বেশি; চার. ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি প্রতিদ্বন্দ্ব^ী দেশগুলোর তুলনায়; পাঁচ. দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব। আমাদের আজকের সম্পাদকীয় এসব চ্যালেঞ্জ ঘিরেই। কেননা এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম সম্ভব না হলে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণটা সহজ হবে না বলেই ধারণা। সবচেয়ে বড় কথা, চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে এখনো সুষম নয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি!
প্রথমেই আসা যাক উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণ দৃষ্টি কেড়েছে সবার। আন্দোলনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না আমরা। তবে কিছুটা প্রাসঙ্গিক বলেই উক্ত আন্দোলনের একটা অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরা দরকার। সেটি হলো, চাকরি পাওয়ার জন্য আমাদের তরুণদের যে বাঁধভাঙ্গা আগ্রহ ও ক্ষোভÑসেটি বলা যায় অনুপস্থিত বেসরকারি খাতের চাকরি পরিস্থিতি উন্নয়নে কিংবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বাধা দূরীকরণে। অর্থনীতিতে সরকারি খাতের অবদান অস্বীকার করছি না আমরা। তবে সত্যের খাতিরে বলতে হবে, উত্তর কোরিয়ার মতো গুটিকয়েক উদাহরণ বাদ দিলে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ভিন্ন অর্থনৈতিক অগ্রসরতার পেছনে বেশিক্ষণ ধাবমান হওয়া কঠিন। যত উপরে উঠব আমরা উন্নয়নের নেতৃত্বে আসতে হবে বেসরকারি খাতকে। তার অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি, সরকারি খাতের পক্ষে স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থানের চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে বেসরকারি খাতে অধিকতর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে হবে এবং সেটা হতে হবে এমন, যেন উচ্চশিক্ষিতরা সেখানে কাজের সুযোগ পায়। দুর্ভাগ্য হলো, যে কারণেই হোক সমাজ বেসরকারি খাতের প্রতি একধরনের অবহেলা প্রদর্শন করে এখনও। সেজন্য এ খাতের দুর্বলতা কম নয়। আবার বেসরকারি খাতের উন্নয়ন সাধনে জনগণ, বিশেষত তরুণ সমাজের পক্ষ থেকে যে ধরনের চাপ আসা উচিত ছিল, সেটি অনুপস্থিত। অথচ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কাম্য। এখানে আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আর আলোচনা করলাম না। একে তো এগুলো টক শো’র জনপ্রিয় আলোচ্যবস্তু; দ্বিতীয়ত. উপাদানগুলো বেসরকারি খাতের উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অনেকে বিশ্বাস করেন, এর উন্নতি ঘটাতে পারলেই পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি ঘটবে।