প্রাক-বাজেট আলোচনা কতটা গুরুত্ব পায় নীতি নির্ধারণে?

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন: এক মাস পরই জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে সরকারের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট। গণমুখী বাজেট উপস্থাপন করতে হলে জনগণের মত নেওয়া প্রয়োজন। এতে যাতে সাধারণ মানুষের মত প্রতিফলিত হয়, সেজন্য সুশীল সমাজও এফজিডি (ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন) টাইপের কিছু আলোচনার ব্যবস্থা করে আসছে। এফজিডির বহু সিদ্ধান্তই বাজেট তৈরিকারকদের কাছে অনেক সময় পৌঁছায় না। রাজনৈতিক দলগুলোও প্রাক-বাজেটে কিছু বলার চেষ্টা করলেও তার দৃশ্যমান হতে তেমন একটা দেখা যায় না। তবে ঘোষিত বাজেটের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা করে রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে। ফলে পরবর্তী সময়ে অনেক কিছুই উপস্থাপিত বাজেটকে সংশোধন করে এবং পরিপূর্ণ বাজেট সংশোধন হয়ে পাস হয়।
বর্তমানে বাজেটকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে আসার যে প্রচেষ্টা চলছে, তা অনেকটা অন্ধের হাতি দেখার মতো। বাজেট বিষয় কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করেছে কোনো কোনো এনজিও। তারা চায় সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের প্রতিফলন ঘটাতে। তাছাড়া বাজেটকে তৃণমূলের কাছে পৌঁছাতে হলে সরকারের তৃণমূল পর্যায়ের কাঠামোগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। সরকারের তৃণমূল কাঠামো হলো স্থানীয় সরকারগুলোÑইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন। আর এই প্রণীত বাজেটকে বাস্তবায়ন করার জন্য এসব সংস্থা কতটা সক্ষম আর কতটা জাতীয় সরকার থেকে সহযোগিতা করতে হবে, সেসব বিষয়ও প্রাক-বাজেট কথনে আসা দরকার। স্থানীয় সরকারগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রমের গতির ওপর নির্ভর করে জাতীয় উন্নয়ন। কোনো সমাজে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের যে ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটেছে, তা পরিমাপ করার সূচকগুলো পূরণ করতে হয় তৃণমূল মানুষের অবস্থার ইতিবাচক উন্নতির নিরিখে। তাই বাজেটকে গণমুখী করতে হলে তৃণমূল সরকার ব্যবস্থায় উপস্থাপিত বাজেটকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে। বাস্তবে দেশের স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের কার্যক্রমটা দেশের আমলারাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমলাদের সই করা চিঠিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যান। প্রশ্ন আসতে পারে, নির্বাচিত হওয়ার কারণে তার সব দোষ কি মাফ হয়ে যাবে? তিনি তো প্রতিনিধিত্বকালে অসততা বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন? এই প্রশ্নগুলোর বিষয়বস্তুটা দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগের দেখা উচিত, আমলাদের নয়। বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুসারে একজন জনপ্রতিনিধিকে ক্ষমতাচ্যুত করা আইনত উপযুক্ত ব্যবস্থা, তাই এ-সম্পর্কিত সিদ্ধান্তটা বিচার বিভাগের নেওয়া দরকার। একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য ইউএনও কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এটি গণতান্ত্রিক দেশে শোভনীয় নয়। ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়নমূলক কাজের বাজেট স্বাধীনভাবে করতে পারে না। এলাকার রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট নির্মাণ সব বিষয়ে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের আমলাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই তৃণমূলের বাজেট ভাবনাটা জাতীয় স্তরে কতটা প্রতিফলিত হয়, সে বিষয়েও সন্দেহ রয়েছে। দেশে আমলানির্ভরতা বাড়ছে, ফলে জনমত প্রকাশের ক্ষেত্রগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, যা আমাদের মহান স্বাধীনতার মূল স্রোতধারা থেকে রাষ্ট্রীয় আর্দশকে বিচ্যুত করার একটা অপচেষ্টা। তৃণমূল পর্যায়ে প্রাক-বাজেট বিষয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তাতে বাজেট সাক্ষরদের উপস্থিতি খুবই কমÑঅনেক সময় এ অজুহাতেই তৃলমূলের মতামতটা বাজেটে প্রতিফলিত হয় না। ধনবাদী অর্থনীতির রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কিছু অজ্ঞ লোককে বাজেট ও শাসনযন্ত্রের অন্যান্য বিষয়ে আলোচনায় নিয়ে আসা হয় অনেকটা কৌশল করে। আর এই কৌশলের পেছনের মূল ফোকাসটারও একটি অন্তর্নিহিত কারণ লুক্কায়িত আছে। এই অসাক্ষরদের আলোচনার বিষয়টি সমাজে ও আন্তর্জাতিকভাবে এভাবে দেখানো হয় যে, বাজেটে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে সমাজের অনগ্রসর গোষ্ঠীর মতামত দিচ্ছি। অনগ্রসর জনগো®ী¤র মতামত দেওয়া মানে দেশের ইতিবাচক উন্নয়ন হয়েছে বলেই এই অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বাজেট বিষয়ের ওপর মত দিতে পারছে। এ ধরনের কার্যক্রম একটি ইতিবাচক নয়, এটি নেতিবাচক কার্যক্রম যা একটি গোষ্ঠীকেই শুধু লাভবান করে। এ ধরনের বাজেট-বিষয়ক ব্যবস্থাটিতে অনাবশ্যক কার্যক্রম সংগঠিত করার পেছনে কলকাঠি নাড়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো এনজিওগুলোকে বিভিন্নভাবে সাহায্য প্রদান করে, আর এনজিওগুলো বাজেট-সম্পর্কিত বিষয়বস্তুতে বাজেট অসাক্ষরদের নিয়ে প্রাক-বাজেট পর্যালোচনায় রপ্ত হয়।
আমলানির্ভর বাজেটে সাধারণ জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন কম হয়। দেশ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার করল, কিন্তু প্রতিটি বাজেট এখনও প্রস্তুত হয় আমলাতন্ত্রের কার্যালয়ে। দেশে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের পর কোনো অর্থনীতি জানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অর্থমন্ত্রী হয়নি। স্বাধীন দেশের বাজেট নাকি এখনও প্রস্তুত হয় আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা কোনো বন্ধুপ্রতিম দেশের পরামর্শে। যদি তা-ই হয়, তাহলে কথিত তৃণমূলে ঘটা করে আয়োজিত প্রাক-বাজেট কতটা বাজেটকে প্রভাবিত করছে? আগামী অর্থবছরের বাজেটে নাকি সরকারি কর্মীদেরকে মহার্ঘ ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। অল্প কিছুদিন আগে সরকারি কর্মীদের বেতনকাঠামো দ্বিগুণ করা হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, তাই কর বাড়াতে হবেÑঅর্থমন্ত্রীর গত কয়েক দিনে দেওয়া বক্তব্যের সারসংক্ষেপ। আর এই কর বাড়িয়ে যদি মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে তা হবেÑ‘তেলা মাথায় মাখো তেল, ন্যাড়া মাথায় ভাঙো বেল।’ দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সব মিলে ৩০ লাখ মানুষ চাকরি করছে। তাহলে কি দেশের এগিয়ে যাওয়ার সুফলটা সরকারি কর্মীরাই ভোগ করবে, ছিটেফোঁটাও সাধারণ জনগণ পাবে না। সাধারণ জনগণের ওপর শুধু করের বোঝাই বাড়বে?
দেশের এনজিও কার্যক্রম অনেক কমে গেছে, আর এই এনজিও কার্যক্রম কমে যাওয়ায় অনেক কর্মঠ ব্যক্তি চাকরি হারিয়েছেন। এর ফলে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। এনজিওর চাকরিচ্যুতরা শিক্ষিত বেকার। এ ধরনের বেড়ে যাওয়া বেকারদের মধ্যে অধিকাংশই ৪৫-৫৫ বয়সী। এই বয়সের বেকাররা অন্য কোথাও কাজের জন্য আবেদন করতে পারে না, অপরদিকে বয়সের কারণে নিজ উদ্যোগে নতুন কর্মসংস্থানটি গড়ে তোলাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বর্তমানে এদেশে এ ধরনের বেকারের একটা বিরাট অংশ রয়েছে। এই বেকারেরা অধিকাংশ নিম্নমধ্যবিত্ত হওয়ায় সরকারের ভিজিএফ, ভিজিডি বা অন্য কোনো সহায়তা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না, ফলে চরম দারিদ্র্যে তাদের দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। বিধবা, বয়স্ক ও অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে যেমন মাসিক ভাতা দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি এই মধ্যবয়সী বেকারদেরও ভাতা দেওয়া দরকার। কারণ এই বেকারাও পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন যাপন করছে। বাজেটকে গণমুখী করতে হলে কেবল সরকারি কর্মীদের বেতন না বাড়িয়ে সোশ্যাল সেফটি প্রোগ্রামের আওতা বাড়াতে হবে।

ফ্রিল্যান্স লেখক
রাজশাহী
[email protected]