সারা বাংলা

ফণীর প্রভাবে ফেনী ও ফরিদপুরে শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত

শেয়ার বিজ ডেস্ক: ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ফেনী ও ফরিদপুরে শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরগুনার পাথরঘাটায় প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসে ঘর চাপা পড়ে দাদি ও নাতি নিহত হয়েছে। জয়পুরহাটে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
ফেনী: ফেনীতে গতকাল শনিবার ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ৭৫টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ায় উড়ে গেছে কাঁচা-আধা পাকা বাড়ির ঘরের টিন ও আসবাবপত্র। এর মধ্যে সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চর দরবেশ ও সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া জেলার অন্য উপজেলায় ঝড়ের কারণে বেশ কয়েকটি ঘর-বাড়ি, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছপালা ভেঙে পড়ে।
সরেজমিন দেখা যায়, সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ধান গবেষণা সংলগ্ন এলাকায় রুচিয়া খাতুন, আবু সুফিয়ান, বেলাল হোসেন, মো. মোস্তফা, লাইলী আক্তার, বেবি আক্তার, রিয়াজুল হক, জান্নাতুর লাহের, আনিছুল হক, আলাউদ্দিন, নুরের নবী, আবুল কাশেম, রেজাউল হকের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে একই ইউনিয়নের জলদাসপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মদন মোহন দাস, হর মোহন দাস, যুধিষ্ঠির জলদাসের ঘর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া এলাকার আলম নামে আরও একজনের দোকান উড়িয়ে নিয়ে যায় ঝড়ো হাওয়া।
ফণীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সমন্বয়ক ও ফেনী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এনডিসি রাশেদুজ্জামান জানান, সাতটি বসতঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ও ৬৮টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং এক হাজার ৫০০ একর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে।
চরচান্দিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মিলন জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। বাকিদেরও সহযোগিতার চেষ্টা চলছে।
সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল পারভেজ জানান, সরেজমিন ক্ষতির তালিকা করা হচ্ছে। ওই আলোকে পরে সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
ফরিদপুর: ফণীর ছোবলের শিকার হয়েছে ফরিদপুরের দুটি উপজেলার দুটি ইউনিয়ন। এ দুটি ইউনিয়নে ২৮টি বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। উপড়ে গেছে দেড় শতাধিক গাছ। গত শুক্রবার বিকালে মধুখালী উপজেলার জাহাপুর ও রাতে সদরের ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নে এ ঝড় বয়ে যায়।
ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর, ফতেপুর, ভবানীপুর ও চক ভবানীপুর গ্রামে শুক্রবার রাতে বয়ে যাওয়া ঝড়ে ১৮টি টিনের বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বেশিরভাগ বাড়ির টিনের চাল উড়ে গেছে। এছাড়া ওই চারটি গ্রামে লিচু ও আমগাছসহ শতাধিক গাছ উপড়ে গেছে। তবে প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সত্যতা নিশ্চিত করে ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম মজনু জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
এদিকে শুক্রবার বিকাল ৪টা থেকে সোয়া ৪টার মধ্যে মধুখালী উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। এর ফলে আটটি টিনের ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে, উপড়ে গেছে অর্ধশত গাছ। তবে প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসী জানায়, ইউনিয়নের আখড়া এলাকা থেকে এ টর্নেডোর আকারে ঝড় শুরু হয়ে প্রায় ৭০০ মিটার অংশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা, দরগাবাড়ি ও চর মোনহরদী গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। ইউপি চেয়ারম্যান মোল্লা মো. ইছাহাক জানান, ঝড় শুরু হওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। তবে প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা মনোয়ার জানান, ঝড়ের পর থেকেই ক্ষতির পরিমাপ করার কাজ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ১০ বাড়ির টিনের চাল উড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে ঘরের খাম্বাগুলো অক্ষুণœ রয়েছে। ঝড়ে অর্ধশত লিচু ও আমগাছ উপড়ে গেছে। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতি নিরূপণের চেষ্টা করছেন। যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রোকসানা রহমান জানান, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে পুনর্বাসন কাজ শুরু করা হবে। যাদের বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে তাদের টিন দেওয়া হবে। যাদের খাদ্যের প্রয়োজন তাদের খাবার দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনের ত্রাণ ভাণ্ডারে প্রয়োজনীয় টিন ও খাবার মজুদ রয়েছে।
জয়পুরহাট: ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে জয়পুরহাট জেলায় ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার বিকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে ভারী বর্ষণ হয়। কৃষকরা যখন চার-পাঁচদিন পর তাদের বোরো ধান ঘরে তুলবেন ঠিক এমন সময় হঠাৎ ফণীর প্রভাবে মাঠভর্তি বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা। অন্যদিকে জেলার নিন্মাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বেড়েছে জনদুর্ভোগ।
জানা গেছে, ভারী বর্ষণ হওয়ায় বেশিরভাগ ধানক্ষেতে পানি জমে গেছে। অনেক মাঠে কেটে রাখা ধান এখন পানির নিচে। এছাড়া জেলার নিচু এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
সদর উপজেলার ধারকি গ্রামের ধানচাষি নজরুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটতে পারিনি। তিন বিঘা পাকা ধানের জমিতে পানি জমেছে। মাঠে অনেকের ক্ষেতের ধান নুয়ে পড়ায় ফলন কম হবে। আক্কেলপুর উপজেলার মাতাপুর গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম, কালাই উপজেলার বিয়ালা গ্রামের কৃষক আবদুল করিমসহ জেলার অনেক কৃষক জানান, ‘উঁচু-নিচু সব জমিতেই পানি জমেছে। অনেকের ক্ষেতের ধান এখনও কাঁচা-পাকা, ধান কাটতে আরও সপ্তাহ খানেক সময় লাগবে। এ সময় আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষেতের ধান গাছের গোড়া থেকে ভেঙে পড়েছে। এছাড়া শাকসবজির ক্ষতি হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করেন কৃষক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সুধেন্দ্রনাথ রায় জানান, জেলায় এবার ৭২ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের বোরো ধান চাষ হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় চার হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণসহ কৃষকদের সহায়তা দানের জন্য কৃষি বিভাগ কাজ করছে।
পাথরঘাটা (বরগুনা): পাথরঘাটা উপজেলায় প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসে একটি কাঠের ঘর ভেঙে চাপা পড়ে দাদি ও নাতি নিহত হয়েছে। গত শুক্রবার রাত আড়াইটায় উপজেলার দক্ষিণ চরদুয়ানি গ্রামে বাঁধঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন নুরজাহান (৬০) ও তার নাতি জাহিদুর (৮)। জাহিদুর বাঁধঘাট এলাকার ইব্রাহিম হোসেনের ছেলে।
জানা গেছে, ইব্রাহিম হোসেনের বাড়িটি ছিল কাঠের। বাড়ির একটি কক্ষে দাদি নুরজাহান ও নাতি জাহিদুর ঘুমাচ্ছিলেন। রাতে প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টি হলে ঘরটি ভেঙে পড়লে তারা দুজনই চাপা পড়েন। এ সময় ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। এ ঝড়ো বাতাসের সময় ওই এলাকার আরও প্রায় ৪০-৪৫টি বাড়ি উড়ে গেছে। এ ঘটনায় কজন আহত হয়েছে, তা এখনও জানা যায়নি।

সর্বশেষ..