দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

‘ফণী’র প্রভাবে সারা দেশে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র প্রভাবে ঢাকাসহ সারা দেশে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ অতিক্রম করে। আর ফণীর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় শুক্রবার সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকাতেও কয়েক দফা বৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ফণীর প্রভাবে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
ভারী বর্ষণের সতর্কবাণীতে গতকাল আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র প্রভাবে শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (দিনে ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতিভারী (দিনে ৮৯ মিলিমিটারের বেশি) বর্ষণ হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ বলেন, গতকাল বিকাল নাগাদ ‘ফণী’র অগ্রভাগ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মূল কেন্দ্র আসতে কিছুটা দেরি হলেও ঘূর্ণিঝড়ের মেঘ ঢাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ধারণা ছিল শুক্রবার সন্ধ্যা নাগাদ এটি বাংলাদেশে আসবে। তবে এটি একটি বিশাল বডি। এটি সন্ধ্যা থেকে শুরু করে সারা রাতব্যাপী অতিক্রম করতে থাকবে। এর পুরো ব্যাস বাংলাদেশের সমগ্র আকাশ ছেয়ে ফেলবে মধ্যরাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত।’
এর আগে শুক্রবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। শুক্রবার সাড়ে ১২টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আবহাওয়া অধিদফতরের ৪৪টি বৃষ্টি পরিমাপক কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি কেন্দ্রে বৃষ্টির তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে ময়মনসিংহে ৫৬ মিলিমিটার।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে শুক্রবার এক বিশেষ বার্তায় বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতীয় অঞ্চলগুলোর কতিপয় স্থানে আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হতে পারে। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলগুলোর প্রধান নদীগুলো, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, সুরমা, কুশিয়ারা, কংস, জাদুকাটা ও তিস্তা নদীর পানির পৃষ্ঠ আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। কোথাও কোথাও বিপদসীমা অতিক্রম করে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণী ঘণ্টায় ১৭৫ কিলোমিটারের বেশি গতির বাতাসের শক্তি নিয়ে শুক্রবার সকালে ভারতের ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করার পর অগ্রসর হয় পশ্চিমবঙ্গের দিকে। কিছুটা দুর্বল হয়ে শুক্রবার মধ্যরাতে এটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস ছিল। পরে বৃষ্টি ঝরিয়ে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের ওপর দিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করে পৌঁছাতে পারে ভারতের মেঘালয়ে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিশেষ বার্তায় বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় ও অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিন্মাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আবহাওয়া অফিস মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে গতকাল সন্ধ্যায় ৭ নম্বর এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে। আর কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৫ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব শাহ কামাল।
আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এখনও ঘূর্ণিঝড়টি শক্তিশালী রয়েছে। তাই সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হবে। সরকারের নির্দেশনা না পেলে কেউ যেন আশ্রয়কেন্দ্র ত্যাগ না করেন।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণী বাংলাদেশে আঘাত হানার আগেই মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সব সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
লন্ডনে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী দেশের পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর রাখছেন বলে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তিনি তার কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই তিনি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী সরকারের সব সংস্থা এবং বেসরকারি সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশনা মোতাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে সারা দেশে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলারও প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়ছে।
সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ সব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তার নির্দেশনা মোতাবেক সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো এরই মধ্যে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ঘূর্ণিঝড় ফণীর সম্ভাব্য আঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শুক্র ও শনিবার খোলা রাখা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এদিকে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে ওড়িশায় শত শত গাছ উপড়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় রাজ্যের বেশিরভাগ অংশ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে ঘূর্ণিঝড় ফণী তীর্থনগরী পুরীর ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে গোপালপুর আর চাঁদবালির মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে।
ওই সময় বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৭৫ থেকে ১৮৫ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৯৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে তিনজনের মৃত্যু হয়। যদিও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগেই ওড়িশা উপকূল থেকে প্রায় ১১ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণী-পরবর্তী জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ, চিকিৎসা সহায়তাসহ যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম, খুলনা ও মোংলা নৌ অঞ্চলে নৌবাহিনীর ৩২টি জাহাজ সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় দ্রুততম সময়ে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও চিকিৎসা সহায়তার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
পাশাপাশি খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুরসহ উপকূলীয় দুর্গত এলাকাগুলোতে মোতায়েনের জন্য নৌ কন্টিনজেন্ট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নৌবাহিনীর জাহাজ মেঘনা বরিশালে, বানৌজা তিস্তা ঝালকাঠিতে, এলসিটি-১০৪ বরগুনায় এবং এলসিভিপি-০১১ পটুয়াখালীতে নিয়োজিত থাকবে।
এতে আরও জানানো হয়, জাহাজগুলো জরুরি খাদ্যসামগ্রী হিসেবে দুই হাজার পরিবারের তিন দিনের শুকনা খাবার বহন করছে। প্রতিটি পরিবারের জন্য শুকনা খাবার হিসেবে ১০ কেজি চাল, দুই কেজি ডাল, দুই কেজি তেল, দুই কেজি লবণ, দুই কেজি চিড়া, দুই কেজি মুড়ি, এক কেজি গুড়, প্যাকেট বিস্কুট, মোমবাতি, পলিথিন ব্যাগ, ম্যাচ বক্স, বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যালাইন ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ রয়েছে।
দুর্গত এলাকাগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার জন্য বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও খাবার স্যালাইন বিতরণের কাজে নিয়োজিত থাকবে। অন্যদিকে নৌ কন্টিনজেন্টগুলো অনুরূপ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সড়কপথে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের জন্য নিয়োজিত থাকবে।

সর্বশেষ..