‘ফাইন্যান্স পেশাজীবীদের রয়েছে বিশ্বব্যাপী চাহিদা’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়।  খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার কাসেম গ্রূপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ জাকারিয়া এফসিএ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস মোহাম্মদ জাকারিয়া, এফসিএ কাসেম গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত তেজগাঁও কলেজ থেকে বিকম শেষে পেশাগত ডিগ্রি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি সম্পন্ন করেন। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) একজন সম্মানিত ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

মোহাম্মদ জাকারিয়া: ক্যারিয়ার শুরু করি ১৯৯৭ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ইন্টারনাল অডিট অফিসার হিসেবে। ওই প্রতিষ্ঠানে চার বছর কাজ করার পর ২০০১ সালে সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডে (সাবিনকো) ইন্টারনাল অডিটর হিসেবে যোগ দিই। সাবিনকোয় তিন বছর কাজ করার পর ২০০৭ সাল থেকে কাসেম গ্রুপের সিএফও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিলেন?

মোহাম্মদ জাকারিয়া: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে বেছে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আমি মূলত এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করেছি। মেডিক্যাল কলেজে পড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেটা না হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিই। বোটানিতে সুযোগ পাই। কিন্তু সেখানে ভর্তি না হয়ে তেজগাঁও কলেজে বিএসসিতে ভর্তি হই। কিছুদিন ক্লাস করার পর সিদ্ধান্ত নিই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়ব। তাই বাণিজ্য বিভাগে চলে আসি এবং বিকম পড়ার সিদ্ধান্ত নিই। তারপর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সিতে পড়ার সুবাদে ফাইন্যান্সকে পেশা হিসেবে বেছে নিই।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে একজন ফাইন্যান্স কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন

মোহাম্মদ জাকারিয়া: প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স কর্মকর্তার অনেক ভূমিকা রয়েছে। এখানে কেবল সিএফও বা প্রধান অর্থ কর্মকর্তার একার নয়, বরং ফাইন্যান্স বিভাগের সবার ভ‚মিকা রয়েছে। ফাইন্যান্স বিভাগ প্রতিষ্ঠানের সব দিক সম্পর্কে অবগত থাকে। প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, শক্তিশালী দিক বা কোথায় উন্নতির প্রয়োজন সবকিছু সম্পর্কে সঠিক স্বচ্ছ ধারণা কেবল ফাইন্যান্স বিভাগের কাছেই থাকে। ফাইন্যান্স বিভাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রজেকশন। প্রতিষ্ঠানের অতীত, বর্তমান ফাইন্যান্সিয়াল গ্রোথ অ্যানালাইসিস করে, সরকারের নানা পলিসি চিন্তা করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বা ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ফাইন্যান্স বিভাগ। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের টেকসই উন্নয়নে ফাইন্যান্স বিভাগের গুরুত্ব বা ভূমিকা অপরিসীম।

শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

মোহাম্মদ জাকারিয়া: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) নিয়ে আমাদের দেশে অনেক সমালোচনা হয়েছে। অবশেষে আইনটি পাস হয়েছে। এমনকি এফআরএ’র মাধ্যমে কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এফআরএ হয়েছে মূলত ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য। এছাড়া আইনটি অডিটরদের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। কিন্তু ধরুন, অডিটর তার মতামত প্রকাশ করলেন যে প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট ট্রু অ্যান্ড ফেয়ার অথবা ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট ট্রু অ্যান্ড ফেয়ার নয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট ট্রু অ্যান্ড ফেয়ার না হলেও সিকিউরিটজ এক্সচেঞ্জ কমিশন, ট্যাক্স অথরিটি, বাংলাদেশ ব্যাংক বা রেগুলেটরি বডি থেকে যদি কোনো সুযোগ-সুবিধা পায়, তাহলে অডিটরের রিপোর্ট দিয়ে কোনো লাভ হবে না। তবে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে এর সুফল পাওয়া যাবে এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ে স্বচ্ছতা আসবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের করনীতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মোহাম্মদ জাকারিয়া: আমাদের দেশে সাধারণত কর নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বাজেট ঘোষণার সময়। প্রাইভেট সেক্টরের কথাই বলি, সরকার সবার সুপারিশ নিয়ে থাকে কিন্তু ট্যাক্স রেট বা পলিসি নির্ধারণ সরকারের ইচ্ছামতো হয়। সরকার তার নিজস্ব গতিতে চলে। তার লক্ষ্য অর্জনে যে আইন দরকার, তা গ্রহণ করে। বাংলাদেশে প্রাইভেট সেক্টরে করপোরেট ট্যাক্সের হার তুলনামূলক বেশি। প্রাইভেট সেক্টরের মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। ট্যাক্সের এরিয়া বাড়িয়ে ট্যাক্স রেট কমানো উচিত। ট্যাক্স পলিসির চেয়ে সবচেয়ে বড় বিষয় ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট। ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট অনেক জটিল প্রক্রিয়া। কর দিতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া কর কর্মকর্তাদের ইচ্ছামতো কর নির্ধারণের বিষয় তো আছেই। স্বচ্ছ অডিট রিপোর্ট থাকা সত্তেও তারা বিশ্বাস করতে চায় না। তারা ইচ্ছামতো গ্রস প্রফিট নির্ধারণ করে। কর কর্তৃপক্ষের এ বিষয়গুলো মোটেও ব্যবসাবান্ধব নয়।

শেয়ার বিজ: বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি সিএ ফার্মের সহযোগিতা নেওয়ার প্রবণতা বেশি কেন?

মোহাম্মদ জাকারিয়া: আন্তর্জাতিক মানের জন্যই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অডিট বা অন্য কাজ বিদেশি সিএ ফার্মের মাধ্যমে করা হয়। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মাদার কোম্পানিকে অনুসরণ করতে চায়। মাদার কোম্পানি যে সিএ ফার্মের সহায়তা নেয়, সে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই কাজ সম্পন্ন করতে চায়। তাছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে কাজ করছে এমন ফার্মের সহযোগিতা নিতে চায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বিভিন্ন দেশে এসব অডিট ফার্মের শাখা রয়েছে। সংগত কারণে এমন ফার্মের মাধ্যমে সব দেশে অডিটের কাজ করা হলে কো-অর্ডিনেশন সুন্দর হয়। অডিটও ফলপ্রসূ হয়। তাছাড়া বিশ্বের বড় ফার্মগুলো যেমন কেপিএমজি, আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং, ডেলোটি ও পিডব্লিউসির ওপর বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডাররা বেশি আস্থাশীল। যদিও আমাদের দেশি ফার্মগুলো অনেক ভালো কাজ করে।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স কর্মকর্তার জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

মোহাম্মদ জাকারিয়া: আমাদের দেশে অনেক উদ্যোক্তার একটা ধারণা আছে প্রডাকশন বা মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। কিন্তু ব্যবসার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রপার রেকর্ডিং, সঠিক তথ্য যে থাকা দরকার সে বিষয়টি অনেকেই উপলব্ধি করেন না। যারা এ বিষয়টি উপলব্ধি করেন, তাদের উন্নয়ন টেকসই হয়। ইতিপূর্বে আমাদের দেশে কমপ্লায়েন্স বা নানা আইন-কানুন না মেনে চলার একটা প্রবণতা ছিল। কিন্তু বর্তমানে করপোরেট গভর্নেন্স, কমপ্লায়েন্স ইস্যু নিয়ে সবাই বেশ সচেতন হচ্ছে। এখন উদ্যোক্তাদের প্রপাইটরি স্টাইল থেকে বের হয়ে প্রতিষ্ঠানে কমপ্লায়েন্স কমপ্লাই করে এগিয়ে যাওয়াটা চ্যালেঞ্জের। এছাড়া বিভিন্ন রেগুলেটরি বডির নানা আইন-কানুন প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠা করে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইতিবাচক আচরণ জরুরি। পাশাপাশি পেশাজীবী হিসেবে তাদের বোঝাতে হবে। নানা আইন-কানুন বা কমপ্লায়েন্সের প্রয়োজনীয়তাসহ কস্ট বেনিফিট অ্যানালাইসিস করে উদ্যোক্তাদের বোঝাতে হবে।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে সিএফওকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মোহাম্মদ জাকারিয়া: পেশা হিসেবে সিএফও অনেক আকর্ষণীয় ও চ্যালেঞ্জিং। প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। একই সঙ্গে অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ফাইন্যান্স পেশাজীবীদের বিশ্বব্যাপী রয়েছে ব্যাপক চাহিদা।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?

মোহাম্মদ জাকারিয়া: একটা সময় অনেকে চাইতেন ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হতে। এ দুটো পেশাকেই অনেকে আকর্ষণীয় মনে করতেন। কিন্তু সময় পরিবর্তন হয়েছে। ফাইন্যান্স পেশা এখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ফাইন্যান্স পেশাজীবীরা সহজেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে এ পেশার চর্চা করতে পারেন। যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে আমার পরামর্শ হলো লক্ষ্য ঠিক রাখতে হবে। লক্ষ্য ঠিক রেখে পেশাগত ডিগ্রি অর্জন করতে পারলে সফল অর্থ কর্মকর্তা হওয়া সম্ভব।