ফার্নিচার নগরী বলীরহাট প্রতিদিনের মতো জা

হেদুল করিম সকাল ৯টায় দোকান খোলেন। সুন্দর ও পরিপাটি করে সারিবদ্ধভাবে সাজানো আসবাবপত্র। বাহারি রং ও নজরকাড়া ডিজাইনের আসবাবপত্র যে কারও মন ছুঁঁয়ে যাবে। দেখতে দেখতে একে একে বাজারের প্রায় সব ফার্নিচার দোকানের ঝাঁপি খুলে যায়। শুরু হয় বিক্রি। নতুন আসবাব তৈরির কাজ চলে। এর মধ্যে ক্রেতারাও আসতে শুরু করেন দোকানগুলোয়। ঘুরে ঘুরে ক্রেতারা আসবাবপত্র দেখছেন। কেউ কেউ কিনছেন। কিংবা পছন্দসই আসবাবের অর্ডার দিয়ে যাচ্ছেন। এ দৃশ্য বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাকলিয়ার বলীরহাটের। এখানকার বৃহৎ ফার্নিচার বিক্রয়কেন্দ্র এটি।

গত কয়েক বছরে মহানগরীতে জনসংখ্যার সঙ্গে বেড়েছে আবাসন খাত। নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে অনেক। ভবনগুলোর সৌন্দর্য বাড়াতে প্রয়োজন নান্দনিক ফার্নিচার। সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন আসবাব ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় চাহিদা, সহজলভ্য কাঁচামাল, সস্তা শ্রম প্রভৃতি তাদের ব্যবসা সফল করে তুলছে। তাদের তৈরি নান্দনিক ও বাহারি নকশার আসবাবপত্রে আস্থা রাখছেন গ্রাহকরা। পূর্ব বাকলিয়ার বলীরহাট ও সাবানঘাটা এলাকার ফার্নিচার নির্মাতা ও কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বলীরহাট এলাকাটি কাঠ ও আসবাবশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। স্থানীয় লোকজন তো বটেই, দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে এখানকার আসবাব কিনে থাকেন।

অনুকূল পরিবেশ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কারণে এখানে পনেরো শতাধিক আসবাবপত্র নির্মাতা ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হয় এখানে। এর মধ্যে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা নিট লাভ হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার আসবাবশিল্পকে রফতানিমুখী করতে তাদের আন্তরিকতা ও চেষ্টায় ত্রুটি নেই।

বলীরহাট ফার্নিচার ব্যবসায়ী ও নির্মাতা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ইন্টারন্যাশনাল ফার্নিচারের মালিক মনসুর আলম বলেন, ‘আমাদের মাসিক আয় নির্দিষ্ট নয়। কোনো মাসে ৭০ হাজার টাকা লাভ হয়। কোনো মাসে দেড় লাখ।’ বর্তমানে ব্যবসায় মন্দা বিরাজ করছেÑএমনই জানিয়েছেন তিনি।

প্রায় একই কথা বলেছেন এনএন ফার্নিচারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাঈম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এখন আসবাবপত্র ব্যবসায় ভরা মৌসুম। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসাধসের অন্যতম কারণ। একটা ব্যবসার সঙ্গে অনেক কিছুই জড়িত। এক খাতে মন্দা চললে, তার প্রভাব অন্য খাতেও পড়ে।’

একসময় কর্ণফুলী নদী দিয়ে কাঁচামালসহ অন্য উপকরণ আসত। তৈরীকৃত আসবাব নদীপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হতো। স্বাধীনতার পর সড়কপথে এ ব্যবসার প্রসার লাভ করে। সময় গড়াতে থাকে। ধীরে ধীরে স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করেন এ খাতে। বিশেষ করে অনেক কাঠ ব্যবসায়ী এর সঙ্গে যুক্ত হন। বাজার চাহিদা থাকায় তুলনামূলক কম লাভে বেশি বিক্রি করতে পারছেন ব্যবসায়ীরা।

এন ফার্নিচার ওয়ার্ল্ডের কর্ণধার নাঈম ইসলাম বলেন, স্থানীয় চাহিদার কারণে আমরা ব্যবসা করতে পারছি। তাছাড়া আমরা ৭ থেকে ১০ শতাংশ লাভে ফার্নিচার বিক্রি করি। এতে ক্রেতারা লাভবান হচ্ছেন।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ আসবাব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় শ্রমিক-কর্মীরা চাহিদামতো আলমারি, সোফা, আলনা, খাটসহ নানা আসবাব তৈরি করছেন। বেশিরভাগ দোকানে নতুন কাজের চাপ বেশি। ফলে দোকান মালিক, কারিগর ও শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।

বলীরহাট ফার্নিচার দোকান মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। এখানকার বনাঞ্চল থেকেই আসে আসবাবশিল্পের মূল উপকরণ কাঠ।

বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি সৈয়দ এএসএম নুরউদ্দীন বলেন, ‘আসবাবশিল্পে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য রয়েছে। এ ঐতিহ্য শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ সুনাম ধরে রাখার জন্য আমাদের দেশীয় কাঠের পাশাপাশি হার্ডবোর্ড, প্লাইউড, মেলামাইন, লেমিনেটেড বোর্ড, এমডিএফ বোর্ড, প্লাস্টিক, কাচ প্রভৃতি ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। তাহলে শিল্পটির প্রসার ঘটবে। এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।’